ভারত চীন রাশিয়ার ভূমিকা গণতন্ত্র পরিপন্থি

লেখক: Amadersomaj
প্রকাশ: ৩ মাস আগে


সময় সংবাদ রিপোর্টঃ বাংলাদেশে একনায়কতান্ত্রিক সরকারকে ভারত, চীন ও রাশিয়া যেভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, তা গণতন্ত্র এবং মানুষের মৌলিক অধিকার পরিপন্থি বলে জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে বড় দেশগুলো যেভাবে অন্য দেশের বিরুদ্ধে দোষারোপ করে চলেছে, তা তাঁকে অবাক করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল তপশিল পিছিয়ে একটি সাজানো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না জানিয়ে তিনি বলেন, যতই অত্যাচার-নির্যাতন করুক, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগকেও একদলীয় শাসনের চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ড. মঈন খান। নির্বাচন, চলমান আন্দোলন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা, কিংস পার্টি, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ সার্বিক বিষয়ে তিনি বলেন। বিরোধী দলের এই শীর্ষ নেতা বলেন, একটি কথা স্পষ্ট করতে চাই– গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। হরতাল-অবরোধের পাশাপাশি ভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির বিষয়টিও আমরা পরিকল্পনা করছি।

তিনি বলেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো দুটি ব্লকে বিভক্ত– এটা সবাই জানেন। গণতন্ত্রকামী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ব্লকে। আরেকটি ব্লকে রাশিয়া, চীন এবং বন্ধুরাষ্ট্র ভারত। সবার যে চিন্তাধারা একই হবে, তেমন নয়। দুটি ব্লকের মৌলিক পার্থক্য বাংলাদেশের মানুষকে উপলব্ধি করতে হবে। মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, আজ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্ব স্পষ্ট ভাষায় কিছু কঠিন পদক্ষেপ নিচ্ছে; স্যাংশন ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান আর সুশাসন ফিরিয়ে আনা ও দুর্নীতি দূর করা। অন্য ব্লকটি বলছে, বাংলাদেশে যে ব্যবস্থা চলছে, তা চলতে থাকবে। এখানে তারা তাদের ভাষায়, কোনো ‘হস্তক্ষেপ’ করতে চায় না। আজ কেউ যদি গণতন্ত্রের বিষয় নিয়ে কথা বলে, এটা কোনো রাষ্ট্রীয় বা ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে পড়ে না। আমরা যদি বলি, বিশ্ব বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চায়, যদি তারা মানবাধিকারের কথা বলে– এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে চিহ্নিত হবে না। দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কথা বললে তা অভ্যন্তরীণ বিষয় হতে পারে না। দুটি ব্লকের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেশের মানুষের কাছে আজ অত্যন্ত স্পষ্ট। এর জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিগ্রিধারী হতে হবে না।

তিনি বলেন,আমার কাছে পরস্পরবিরোধী দোষারোপ চোখে পড়েনি। রুশরা যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করেছে, যা তারা খণ্ডন করেছে মাত্র। ভারত, চীন ও রাশিয়ার বক্তব্যের জবাবে পশ্চিমা বিশ্ব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা সেসব দেশকে দোষারোপ করেনি। তবে আমার অবাক লেগেছে, আগে যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ছিল, আজ তা আর নেই।

তিনি বলেন,আমরা মনে করছি, বন্ধুরাষ্ট্র ভারত, চীন ও রাশিয়া যে ধরনের বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক এবং দুর্নীতিপরায়ণ সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, তা ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থবিরোধী। সে কারণে আমরা বক্তব্য-বিবৃতিগুলো দিয়েছি। আগামী নির্বাচনের যে প্রস্তুতি সরকার নিচ্ছে, তাতে বৃহত্তর বিরোধী দল বিএনপির প্রয়োজন নেই– আওয়ামী সরকার বলছে। তারা একাই নির্বাচন করবে। এমনকি তারা কিছু সাজানো গৃহপালিত বিরোধী দল সংসদে বসিয়ে দিতে সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে। এটা স্পষ্ট, সরকার আবারও ক্ষমতায় থেকে যেভাবে লুটপাট করে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে, তা অব্যাহত রাখতে এবং দুর্নীতিবাজ প্রশাসনকে নিয়ে আগামীতে দেশ শাসন করতে চায়। সেই প্রক্রিয়াকে যারা সমর্থন করছে, তাদের বিরুদ্ধে বিএনপি বক্তব্য দিচ্ছে। এটা ভারত, চীন ও রাশিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে বিএনপির কোনো বক্তব্য নয়। এটা স্পষ্ট করে বলছি, বাংলাদেশে একনায়কতান্ত্রিক সরকারকে তারা যেভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, আমরা মনে করি, তা গণতন্ত্র ও মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি।

তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশে সংবিধান থাকে। কোনো দেশের মানুষ সংবিধানের জন্য তৈরি হয় না; সংবিধান মানুষের জন্য তৈরি হয়। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে সংবিধান পরিবর্তন হয়নি। এমনকি বাংলাদেশের সংবিধান অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে। এমনকি পরিবর্তনের পরও সংসদে তা বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কাজেই সংবিধান সংশোধন হওয়া-না হওয়া কোনো মৌলিক সমস্যা নয়।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেবে, সে কারণে সরকার সুশাসন ও ভোটের অধিকার এবং গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেবে– এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। আওয়ামী লীগ নিজেদের দাবি করে দেশের প্রাচীনতম ও গণমানুষের দল। তাদের আচার-আচরণ ও কর্মপন্থা তা প্রমাণ করে না। আগের ইতিহাস বাদ দিলাম। গত ১৫ বছরে মৌলিক নীতিগুলোর পরিপন্থি কাজ করে চলেছে। আমি বিশ্বাস করি, স্বপ্রণোদিত হয়ে আওয়ামী লীগের সুশাসন, গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার ফিরিয়ে আনা উচিত। দুই লাইন লিখে কে কার সমালোচনা করেছে, সে জন্য তাকে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে গায়েব করে দেবে– এটা ঠিক নয়। একদলীয় শাসনের চিন্তাধারা থেকে আওয়ামী লীগকে বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু আমরা বলছি না, আপনারা সুশীল সমাজসহ অনেকের কথাই শুনছেন। যারা শুরু থেকে আওয়ামী লীগ করেছেন, তাদের অনেকের মুখ থেকে গত কয়েক দিনে কিছু কথাও আমরা শুনেছি। আওয়ামী লীগের বর্তমান চিন্তাধারা ও কার্যপদ্ধতির প্রতিবাদ করছেন তারা। বর্তমান একদলীয় শাসনব্যবস্থাকে তারা সঠিক মনে করছেন না।

ড. মঈন খান বলেন,আজ দেশে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, এটা তো বিএনপি করেনি। ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা ঘটেছে, তার ফলে রাতারাতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজকে আমরা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করছি। আমরা দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন করছি। সে উদ্দেশ্যটি সফল করার জন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছি। আন্দোলনে হরতাল-অবরোধসহ অনেক প্রক্রিয়া থাকতে পারে। বড় কথা হচ্ছে, দেশের কোটি কোটি মানুষ একদলীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাচ্ছে– এ বার্তা পৌঁছে দিতে কর্মসূচি পালন করছি।
তিনি বলেন,রাজনীতিতে কঠিন ও সহজ পরিস্থিতি– সবকিছুই মোকাবিলা করতে হয়। সরকার বিএনপিকে দমন করতে বন্দুক, বুলেট, জলকামান, টিয়ার গ্যাসের শেল, হ্যান্ড গ্রেনেড ব্যবহার করছে। বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতে আরও ব্যবহার করছে প্রশাসনকে। ২৮ অক্টোবরের ক্র্যাকডাউনের পর ১৬ হাজার বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী কারারুদ্ধ। ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ১৬০টির ওপর মামলা দিয়েছে। তবুও এ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিএনপি পিছিয়ে যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় কি কঠিন পরিস্থিতি ছিল না? বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানের অপশাসন দূর করে দেশ স্বাধীন করেনি?



IT Amadersomaj