এন এস আবিদ মাহমুদ, যশোর প্রতিনিধি :
যশোরের সাবেক টিএসআই রফিক দম্পতির স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক আদেশের পর গোপনে তাদের মালিকানাধীন খামার থেকে গরু বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ফের জোরেসোরে আলোচনায় এসেছে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত প্রায় ৮ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ইস্যু।
প্রথমে আয় বহির্ভূত ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৫ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ চাওয়া হয় দুদকের পক্ষে। আর আদালত থেকে আদেশ আসার পর শুধু গরু বিক্রিই নয়, অন্যান্য স্থাবর সম্পদ থেকে নিয়মিত আয় সংগ্রহ করছেন তাদের লোকজন। মালিকানা খবরদারিসহ ভাড়াও তুলছেন তাদের লোকজন।
আবার মালামাল ক্রোক আদেশের পর সাবেক টিএসআই রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ঝর্না ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলায় ঝর্ণার বিরুদ্ধে ৭ কোটি ২৯ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫২ টাকা আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। একইসাথে তিনি দুদকের কাছে ৮ কোটি ৬০ লাখ ১৯ হাজার নয় টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, টিএসআই রফিকের বিরুদ্ধে ৭০ হাজার ৫০০ টাকা আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। একইসাথে তিনি দুদকের কাছে ৩৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৭৫ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন করেছেন বলে উল্লেখ করে দুদক। আর এসব ঘটনায় ও দেশের চলমান পরিস্থিতিতে তাদের স্থাবর সম্পদ সম্পত্তি দেখভালে নিযুক্তদের সাথে এলাকার জনতার বাকবিতন্ডা হচ্ছে। পরিবেশ উত্তপ্ত হচ্ছে।
তথ্য মিলেছে, স্থাবর সম্পদ সম্পত্তি ক্রোক ও অস্থাবর সম্পত্তি ফ্রিজ করতে আদালতের অনুমতি মিললেও তা কার্যকর করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন যশোর। যে কারণে হচ্ছে নানা ভুল বুঝাবুঝি। দুদক যশোর জেলা কার্যালয় থেকে ওই সম্পদ সম্পত্তির রিসিভার নিয়োগের অনুমতি চাওয়া হয়েছে দুদকের প্রধান কার্যালয় ঢাকাতে।
তথ্য মিলেছে, দুদক সহকারী পরিচালক মোশাররফ হোসেনের আবেদনে আদালত গত ২১ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ (সংশোধনী ২০১৯)-এর বিধি ১৮ মোতাবেক রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ঝর্না ইয়াসমিনের অবৈধ সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেন। বিষয়টি জানতে পেরে রফিকুল ইসলাম তার সম্পদ বিক্রির পাঁয়তারা শুরু করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় তার গরুর খামার থেকে গরু বিক্রি করে চলেছেন।
আদালতের ক্রোক ও ফ্রিজ আদেশের পরও যশোরের শহরতলী পাগলাদহে সাবেক টিএসআই রফিকুল ইসলাম ও ঝর্ণা ইয়াসমিন দম্পতির মালিকানাধীন মায়ের দোয়া গোখামার থেকে দফায় দফায় গরু বিক্রি হয়ে যাওয়া ও স্থানীয়দের বাধা সংক্রান্ত ঘটনায় ফের জোরেসোরে আলোচনা হচ্ছে স্থাবর অস্থাবর সম্পদ সম্পত্তি নিয়ে। ক্রোক ও ফিজ্র অনুমতি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে ২১ সেপ্টেম্বর বিক্রি করে দেয়া একটি গরুর বড় চালান আটকে দেয় জনতা। আর ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্রোক আদেশ এখন কি পর্যায়ে আছে তা নিয়ে নানামুখি বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।
আদালত সূত্র থেকে তথ্য মিলেছে, দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধানে সাবেক টিএসআই রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ঝর্ণা ইয়াসমিনের জ্ঞাত আয় বহিভূত ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৫ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিললে উপপরিচালক মোশারফ হোসেন ওই সম্পদ ক্রোকের আবেদন করেন আদালতে। এর প্রেক্ষিতে যশোরের সিনিয়র স্পেশাল জজ নাজমুল আলম ক্রোক আদেশ দেন।
দুদকের অনুসন্ধানে তথ্য মেলে, সারাদেশে টিএসআই রফিক দম্পতির সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে গোপালগঞ্জ জেলায় সাততলা বিল্ডিং, যশোর শহরে একটি ছয়তলা বাড়ি, একটি দুইতলা মার্কেট, একটি দুইতলা ভবন, ঢাকাতে ফ্লাট, রাজশাহী শহরে বাড়ি, খুলনায় জমি ফ্লাটসহ যশোরের পাগলাদহে গরুর খামারসহ নানা ধরণের ব্যবসা রয়েছে। যশোরের পাগলাদহে মায়ের দোয়া গোখামার ৮৫ শতক জমি জুড়ে রয়েছে। ওই খামারের জমির দাম ৪০ লাখ ১১ হাজার টাকা।
সম্পত্তি ও সম্পদ ক্রোক আদেশের আওতায় এই খামারটিও রয়েছে। তবে ওই সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র ওই খামারে কিংবা যশোর কেতোয়ালি থানাতেও নেই। যে কারণে ইচ্ছামত ওই খামারের সম্পদ বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। এ মধ্যে গরু অন্যতম। চলমান এই ঘটনায় দৈনিক গ্রামের কাগজের পক্ষে খোঁজখবর নিতে গেলে তথ্য মিলেছে, প্রকৃত পক্ষে ক্রোক অনুমতি বা আদেশ আদালত থেকে দেয়া হলেও তা এখনও কার্যকর হয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশন যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক টিএসআই রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ঝর্ণা ইয়াসমিনের স্থাবর সম্পদ সম্পত্তি ক্রোক ও অস্থাবর সম্পত্তি ফ্রিজ করতে আদালতের অনুমতি মিললেও তা কার্যকর করতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন যশোর। যে কারণে হচ্ছে নানা ভুল বুঝাবুঝি। দুদক যশোর জেলা কর্যালয় থেকে ওই সম্পদ সম্পত্তির রিসিভার নিয়োগের অনুমতি চাওয়া হয়েছে দুদকের প্রধান কার্যালয় ঢাকাতে। তবে এখন পর্যন্ত অনুমতি সংক্রান্ত কেনোপত্র যশোরে আসেনি। যে কারণে এখনও রিসিভার নিযুক্ত করা যায়নি। যে কারণে কার্যত এখনও ওই সম্পদ ক্রোক করা হয়নি। ওটা আগের মতই আছে। তবে দ্রুত এ সংক্রান্ত সমাধানে পৌঁছাবে দুদক যশোর।
সিরাজুল ইসলাম আরো জানান, ক্রোকের আদেশ হওয়া সম্পত্তির মধ্যে ওই গরুর খামার ছাড়াও স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সুকতাইল মৌজাতে ১৮৩ দশমিক ৪ শতক। একই উপজেলার পাইকেরডাঙ্গা মৌজাতে ৬৭ শতক। সর্বমোট ২৪৯ দশমিক ৪ শতক। যার মূল্য ১২ লাখ ৫০ হাজার ৯২৫ টাকা। রফিকের স্ত্রী ইয়াসমিনের গোপালগঞ্জ পৌরসভার খাটরা মৌজাতে ৭ শতকের মধ্যে ২ দশমিক ৩৩ শতক। বাকি অবশিষ্ট তার শ্যালিকার নামে ক্রয় করা। জমির মূল্য ১৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৬৬ টাকা। স্থাপনার মূল্য ১ কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৬ টাকা।
আর যশোর পৌরসভার বারান্দি মৌজায় ৬ দশমিক ৬৭ শতক জমি। যার মূল্য ১৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। স্থাপনার মূল্য ৯১ হাজার ৬১ হাজার ৬৯৭ টাকা। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন সেনপাড়া পার্বত্য মৌজাতে ৮ দশমিক ২৪ কাঠার ০০৯০ দশমিক ৬ অযুতাংশ। জমির মূল্য ১১ লাখ ১২ হাজার ৫৭১ টাকা। ফ্ল্যাট নির্মাণ ৫০ লাখ টাকা। ঢাকা জেলার বিলামালিয়া মৌজাতে ৬ দশমিক ৫০ শতক; যার মূল্য ৮৮ হাজার টাকা।
খুলনা সিটি করপোরেশন মুজগুন্নি আবাসিক মৌজাতে ০ দশমিক ০৬৬১ একর। যার মূল্য ১০ হাজার টাকা। খুলনা ফুলতলায় ৯ নম্বর মশিয়ালিতে ৭ শতক। যার মূল্য ৭৩ হাজার ৫শ’ টাকা। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন হড়গ্রাম মৌজাতে ০ দশমিক ০০৩০৮ একর ১০ লাখ টাকা। যশোর সদরের পাগলাদহ মৌজাতে ১৯১ শতক জমির মূল্য ১১ লাখ ৮৭ হাজার ২শ’ টাকা। খুলনার ফুলতলা মশিয়ালি মৌজাতে এক একর ৫০ শতক স্ত্রীর নামে। বাকি অংশ শ্যালিকার নামে ক্রয় করা। যার মূল্য ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা, অবশিষ্ট মূল্য ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫শ’ টাকা। যশোর কোতোয়ালির পাগলাদাহ মৌজাতে ৮৫ শতক। যার জমির মূল্য ৪০ লাখ ১১ হাজার ৭শ’ টাকা। স্থাপনার মূল্য ৮৯ লাখ ১৫ হাজার ২শ’২৩ টাকা।
যশোর পৌরসভার বারান্দী মৌজাতে ১ দশমিক ৩৮ শতক জমির মূল্য ১৩ লাখ ৪৫ হাজার ৯০০ টাকা। স্থাপনার মূল্য ৯২ লাখ ৩ হাজার ৬৪৭ টাকা। একই স্থানে ৬ দশমিক ৫০ শতকের বাড়ির মূল্য ৩৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। মোট ৪২৯ দশমিক ৫৪৪ শতক; যার মোট মূল্য ৫ কোটি ৮২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ টাকা।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর সিরাজুল ইসলাম আরো জানান, একে একে এই সম্পদ সম্পত্তি দুদক নিযুক্ত রিসিভারের দায়িত্বে চলে আসবে। আর তখন যথেচ্ছা করার সুযোগ থাকবে না টিএসআই রফিকুল ইসলাম কিংবা তার লোকজনের।
এদিকে সাবেক টিএসআই রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ঝর্না ইয়াসমিন দম্পতির বিরুদ্ধে করা মামলায় ৭ কোটি ২৯ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫২ টাকা ও ৭০ হাজার ৫০০ টাকা আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। দু'টি মামলার বিবরণ থেকে তথ্য মেলে, টিএসআই রফিক ১৯৮৭ সালের ১০ অক্টোবর পুলিশ বিভাগে কনস্টেবল পদে যোগদান করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি পদোন্নতি পেয়ে এটিএসআই, ২০১৬ সালে পদোন্নতি পেয়ে টিএসআই এবং ২০২১ সালের ২৮ জুন ফের পদোন্নতি পেয়ে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে তার কাছে সম্পদ বিবরণীর তথ্য চায় দুদক। এর প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১৬ মে অভিযুক্ত রফিক তার সম্পদ বিবরণী দুদকে দাখিল করেন। এতে তিনি জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ৭০ হাজার ৫০০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেন।
অপরদিকে, তার স্ত্রী অভিযুক্ত ঝর্না ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ উপার্জনের সত্যতা পাওয়ায় তাকে সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে বলা হয়। তিনি সম্পদ দেখান ২ কোটি ৬১ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৯ টাকার। কিন্তু দুদক অনুসন্ধানে তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ পেয়েছে ৭ কোটি ২৯ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫২ টাকার। তার স্বামী অভিযুক্ত সাবেক টিএসআই রফিক পুলিশ বিভাগে কর্মরত থেকে অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করে তার স্ত্রী ঝর্না ইয়াসমিনের নামে সম্পদ গড়েছেন। বিপুল পরিমান এসব সম্পদ নিয়ে হচ্ছে জোর আলোচনা।
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন