ডা.মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
ছবিটি আবার দেখুন। ভালো করে দেখুন। মনে হচ্ছে না এটা রাষ্ট্রপতি ভবন। মনে হচ্ছে কোনো পুরনো জমিদার বাড়ির দরবারে নতুন জামাই এসে শশুরবাড়ির আসবাবপত্র পরীক্ষা করছে। সোফাটা কেমন? নরম তো? হাতলটা সোনার? ভালো, ভালো। আর ওই যে মাঝখানে বসে আছেন একজন — সাদা পোশাকে, কিছুটা হতভম্ব — উনি কে? উনি হয়তো বাড়ির নতুন গোমস্তা। নাকি দারোয়ান?
না, ভুল। উনি বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। হ্যাঁ, সেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি যাঁর স্বাক্ষরে আইন হয়, যাঁর নামে সরকার চলে। আর তাঁর সামনে, পায়ের উপর পা তুলে, হেলান দিয়ে, মোবাইল হাতে, যেন কোনো মালিক তাঁর বাগানবাড়িতে বসে আছেন — সেই মহান ব্যক্তি হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামাই।
জামাই। শুধু জামাই। কোনো পদ নেই। কোনো দায়িত্ব নেই। কোনো জনপ্রিয়তা নেই। কিন্তু আছে একটা জিনিস — শশুরবাড়ির গরম চাল।
রাষ্ট্রপতি নাকি জামাইদের বসার ঘর?
বাংলাদেশে এখন নতুন একটা সংবিধান লেখা হচ্ছে। লিখছেন না, ছবিতে তুলে ধরছেন এই মহান জামাই। সেই সংবিধানে বলা হচ্ছে:
"মহামান্য রাষ্ট্রপতির সামনে বসার সময় পা তোলা বাধ্যতামূলক। হেলান দেওয়া বাধ্যতামূলক। মোবাইলে ঘাঁটাঘাঁটি বাধ্যতামূলক। আর রাষ্ট্রপতিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকা বাধ্যতামূলক।"
এই ছবি দেখে কে বলবে যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংকট আছে? এখানে তো পুরোপুরি গণতন্ত্র আছে! একজন সাধারণ জামাই রাষ্ট্রপতির সমান আসনে বসতে পারছেন। এটাই তো প্রকৃত গণতন্ত্র! এটাই তো সমতা!
কিন্তু সমতা কোথায়? একজন দিনমজুর কি রাষ্ট্রপতির সামনে এভাবে বসতে পারে? একজন রিকশাচালক কি পায়ের উপর পা তুলে রাষ্ট্রপতি ভবনে ঢুকতে পারে? না, ভাই। সেই সমতা শুধু জামাইদের জন্য। শুধু এমপির ভাইয়ের জন্য। শুধু মন্ত্রীর ছেলের জন্য। বাকি সবাই তো জনতা। আর জনতার কাজ হলো মাথা নত করা, জুতো চাটা, আর ভোটের দিন লাইনে দাঁড়ানো।
শশুরবাড়ির দাপট, রাষ্ট্রের উপর
বাংলাদেশে একটা কথা প্রচলিত আছে — শশুরের সামনে পায়ের উপর পা তোলা যায় না। এটা নাকি আদব। কিন্তু এই মহান জামাই প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, তিনি শশুরের সামনে নন,মহামান্য রাষ্ট্রপতির সামনে পা তুলেছেন। অর্থাৎ, তাঁর কাছে রাষ্ট্রপতি শশুরের চেয়েও ছোট।
এটাই বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। এখানে শশুরবাড়ি রাষ্ট্রের চেয়ে বড়। এখানে জামাইর অহংকার সংবিধানের চেয়ে বড়। এখানে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠানতন্ত্রকে গালে থাপ্পড় মারে আর প্রতিষ্ঠানতন্ত্র হাসিমুখে সেটা সহ্য করে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কি দেখেন না? নাকি দেখেও চোখ বন্ধ করেন? নাকি তাঁর কাছেও এটা স্বাভাবিক যে তাঁর জামাই মহামান্য রাষ্ট্রপতির সমান? হয়তো তিনি ভাবেন, "আমার জামাই তো আমার জামাই। রাষ্ট্রপতি কে? আমার জামাইর কাছে তো সেও একজন সেবক।"
রাষ্ট্রপতি: পদ নাকি পুতুল?
এই ছবিতে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো মহামান্য রাষ্ট্রপতির মুখের অভিব্যক্তি। তিনি দেখছেন। দেখেও না দেখার ভঙ্গি করছেন। কেন? কারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ এখন একটা সাজানো কাঠের পুতুল মাত্র। যাঁকে যেখানে বসানো হয়, সেখানে বসে থাকেন। যাঁকে যেভাবে বসতে বলা হয়, সেভাবে বসেন। আর যদি কেউ তাঁর সামনে পা তুলে বসে, তিনি ভাবেন — "হয়তো এটাই নতুন প্রোটোকল।"
রাষ্ট্রপতি ভবনে যদি এমন হয়, তাহলে দেশের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কী অবস্থা? সংসদে এমপিরা কি স্পিকারের মাথার উপর পা তুলে বসবে? আদালতে আইনজীবীরা কি বিচারপতির চেয়ারে হেলান দিয়ে বসবে? হাসপাতালে রোগীরা কি ডাক্তারের টেবিলে পা তুলে বসবে?
হয়তো বসবে। কারণ বাংলাদেশে এখন একটাই আইন — যার ক্ষমতা তারই আইন।
জামাই শ্রেণী: রাষ্ট্রের অদৃশ্য শাসক
বাংলাদেশে এখন একটা নতুন শ্রেণীর উত্থান ঘটেছে — জামাই শ্রেণী। যাঁরা কোনো নির্বাচনে জয়লাভ করেননি, কোনো পদে নেই, কোনো দায়িত্ব নেই, কিন্তু রাষ্ট্র চালান। তাঁরা শুধু শশুরবাড়ির জামাই নন, তাঁরা রাষ্ট্রের জামাই। আর জামাইরা যেমন শশুরবাড়িতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়, তেমনি রাষ্ট্রের জামাইরাও সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়।
এই জামাইরা ব্যাংক লুট করে, টেন্ডার বাগিয়ে নেয়, জমি দখল করে, আর রাষ্ট্রপতি ভবনে বসে পায়ের উপর পা তুলে চা খায়। আর আমরা? আমরা দেখি। দেখে মুগ্ধ হই। ভাবি, "ওহ্, কী আত্মবিশ্বাস! কী পারফেক্ট বডি ল্যাংগুয়েজ!"
না, ভাই। এটা আত্মবিশ্বাস নয়। এটা অহংকার। এটা শুধু অহংকারও নয়। এটা একটা বার্তা — "আমি এখানে তোমাদের সমান নই, আমি তোমাদের চেয়ে বড়। রাষ্ট্রপতি হোক বা জনতা — সবাই আমার নিচে।"
উপসংহার: পায়ের উপর পা, জনতার গলায় ফাঁস
ছবিটি শুধু একটা ছবি নয়। এটা একটা রক্তক্ষরণ। এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মরচে ধরা লাশ। এটা প্রমাণ করে যে, এই দেশে এখন ক্ষমতা এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, একজন জামাই রাষ্ট্রপতিকে নিজের বাড়ির চাকর মনে করে।
আর আমরা? আমরা এখনো ভোট দিই। আমরা এখনো মিছিল করি। আমরা এখনো ভাবি, "এবার ভালো কিছু হবে।" কিন্তু ছবিটি বলে দেয় — তোমাদের ভোটের কোনো দাম নেই। কারণ ক্ষমতা তো এখন জামাইদের হাতে। রাষ্ট্রপতি তো তাঁদের সামনে পায়ের উপর পা তোলা দেখেও চুপ। তোমরা কে?
তাই বলি — যে দেশে মহামান্য রাষ্ট্রপতি একজন জামাইর সামনে ছোট, সে দেশের জনতার কোনো দিন বড় হওয়ার সুযোগ নেই। যে দেশে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবারতন্ত্রের কাছে নত হয়, সে দেশে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়ে গেছে।
আর সেই পেরেকটা? সেটা তো এই ছবিতেই দেখা যাচ্ছে — একটা পা, যা রাষ্ট্রপতির মুখের উপর তোলা হয়েছে।
__ ডা. মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন