মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
"একজন শিল্পীর মুখে ছুঁড়ে মারা একটি বোতল... আজকে আমাকে শুধু শিল্পীর নিরাপত্তা নয়, জুলাইয়ের নৈতিক পরিণতি নিয়েও কথা বলতে বাধ্য করছে। প্রশ্নটি এখন আর শুধু এই নয় যে জনপ্রিয় অর্ক ব্যান্ড শিল্পী হাসান ভাইয়ের দিকে বোতলটি আসলে কে ছুঁড়েছে; প্রশ্ন হলো— যে জুলাই মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল, সেই জুলাইয়ের মঞ্চেই একজন শিল্পীর মর্যাদা পদদলিত হলো কীভাবে?
গত ৫ই আগস্ট 'বর্ষা বিপ্লব' এর গান কনসার্টে হাসান পারফর্ম করেছে। সেই একই মঞ্চে আর্ক ব্যান্ডের ভোকালিস্ট আমাদের হাসান—কে লক্ষ্য করে দর্শক সারি থেকে পানির বোতল ছোঁড়া হয়েছে এবং তার মুখে লেগেছে।
আমি এই ঘটনায় গভীরভাবে ব্যথিত, ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত। হাসানকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া সেই বোতলটি শুধু একজন ব্যক্তি হাসানের গায়ে লাগেনি, সমগ্র শিল্পী সমাজের মর্যাদায় আঘাত করেছে।
জুলাই কোনো দল, কোনো গোষ্ঠী কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জুলাইয়ের নামে কাউকে দেশপ্রেমের সনদ দেওয়ার কিংবা কারও নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই।
আচ্ছা, জুলাইয়ের অর্জন কি সেদিনই ধূলিসাৎ হয়নি যেদিন আপনারা শেখ হাসিনার অন্তর্বাস দাবি করে নারীর প্রাইভেট গারমেন্টস—ব্রা হাতে নিয়ে উল্লাস করেছিলেন?
জুলাইয়ের ধ্বংস কি সেদিন থেকে শুরু হয়নি যেদিন থেকে সারা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো ভাঙা শুরু হয়েছে?
একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে বলে রাখা প্রয়োজন, মনে করা প্রয়োজন বারবার করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়নি—
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একবারই, ১৯৭১ সালে। জুলাই সফল হয়েছিল শুধু কয়েকজন সমন্বয়ক নেতা কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর কারণে নয়। আমাদের মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বলেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, শিল্পী, অভিভাবক, পেশাজীবী— সাধারণ নাগরিকের সম্মিলিত সাহসেই কিন্তু আসলে জুলাইয়ের আসল শক্তি ছিল।
স্বাধীনতা একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, আর গণঅভ্যুত্থান একটি বিদ্যমান রাষ্ট্রকে সংস্কার, সংশোধন ও জবাবদিহিতার পথে ফিরিয়ে আনার দাবি জানায়। দুটির ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে, কিন্তু দুটিকে এক করে ফেললে ১৯৭১ এবং ২০২৪— দুই ইতিহাসের প্রতি আসলে অবিচার করা হয়। আমরা আইনের শাসন চাই, মবের শাসন নয়। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না,যেখানে আমি যাকে পছন্দ করি তাকে দেশপ্রেমিক এবং যাকে পছন্দ করি না তাকে দেশদ্রোহী বলবো।
আমরা সবাই যেন কেন জানি না অন্য মানুষটিকে নিজের মতো করে তৈরি করতে চাই। 'তুমি আমার মতো কথা বলো না কেন?', 'তুমি আমার মতো পোশাক পরো না কেন?', 'তুমি আমার মতো করে ভাবো না কেন?', 'রাজনীতি বোঝো না কেন আমার মতো করে?', 'তুমি আমার মতো ইতিহাস কেন ব্যাখ্যা করো না?'— কিন্তু গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো তোমাকে আমার মতো হতে হবে না। ভিন্ন হয়েও, ভিন্ন মতের হয়েও আমরা সমান অধিকারে, নাগরিক অধিকার নিয়ে এই দেশে বসবাস করতে পারবো।
একসময় বঙ্গবন্ধুর অন্ধ বন্দনা এদেশে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে এক প্রকার বিষিয়ে তোলা হয়েছিল সাধারণ মানুষের কাছে। আমি এটার নিজেই ভুক্তভোগী। আমি একটা ছোট্ট ইনসিডেন্ট বলি— আমার স্কুলে, আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। আমার স্কুলে একটা অনুষ্ঠানে আমাকে 'আমার সোনার বাংলা' গাইতে দেওয়া হয়নি (জেমসের আমার সোনার বাংলা), কারণ সেখানে একটি লাইন আছে— 'শহীদ জিয়ার স্বপ্ন'। এবং পরবর্তীতে ওই গানের এগেইনস্টেই কিন্তু আমাকে আরেকটি গান তুলতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, যেটা আমি ১০-১৫ মিনিটে তুলেছিলাম এবং পারফর্ম করেছিলাম। সো, এটা কিন্তু স্কুলের অ্যাডমিন থেকেই আমাদের ইনস্ট্রাকশন দেওয়া হয়েছিল, আমাকে বিশেষ করে যেহেতু আমি লিডে ছিলাম।
কিন্তু এখন আবার দেখি সেই মানুষটাকেই অন্ধভাবে ঘৃণা করা যেন দেশপ্রেমের নতুন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী নই, একইসঙ্গে ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতিতেও আমি বিশ্বাস করি না। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির সমালোচনা করা যায়,
তার রাজনৈতিক ভুল নিয়ে প্রশ্ন করা যায়, কিন্তু ইতিহাসকে প্রতিদিনের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ভালোবাসা ও ঘৃণার সুইচ দিয়ে পরিচালনা করা যায় না।
সংসদে দাঁড়িয়ে একজন সদস্য যেখানে ঘোষণা করে যে— 'জেন-জি’রা ৭২-এর সংবিধান চায় না', তখন আসলে প্রশ্ন জাগে যে, সমগ্র একটি প্রজন্মের হয়ে কথা বলার এই ম্যান্ডেট তাকে কে দিয়েছে? কোন জরিপে, কোন গণভোটে, কোন জাতীয় আলোচনায় একটি সম্পূর্ণ প্রজন্ম এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে? আমি তো জেন-জি’রই অংশ। সংবিধান অবশ্যই আলোচনা, সমালোচনা ও সংশোধনের বিষয় হতে পারে, কিন্তু একটি প্রজন্মের নাম ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে পুরো প্রজন্মের সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষণা করাটা আসলে গণতান্ত্রিক আচরণ নয় কোনোভাবেই।
আবার যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় কবি নজরুলের 'দুর্গম গিরি কান্তার মরু' হয়ে যায় 'দুর্গম গিরি কান্তার গরু'— তখন আসলে হাসলেই এটার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং শঙ্কিত হতে হয়। কবি নজরুলের কবরের অন্য যে পাশটা আছে, সেটা কবে জানি তারা দখল করে নেন, অর্জন করে নেন— আমি তো জানি না। নজরুলকে উদ্ধৃত করলেই নজরুলের উত্তরাধিকার অর্জন করা যায় না। নজরুলের উত্তরাধিকার ধারণ করতে হলে তার সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি দায়বদ্ধতা ধারণ করতে হয়।
দেশপ্রেম মানে কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়। দেশপ্রেম মানে দেশের মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং নিরাপত্তার প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। ভিন্নমতের
মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশপ্রেম। ক্ষমতার পাশে নয়, ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো দেশপ্রেম। ভয়মুক্ত সাংস্কৃতিক ধারা অব্যাহত রাখা দেশপ্রেম। দেশের সকল প্রাণ ও প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানই দেশপ্রেম। আমরা সবাই ভালো সরকার চাই, কিন্তু আমরা নিজেরা ভালো নাগরিক হওয়ার দায়িত্ব থেকে সবসময় এড়িয়ে যাই।
যেমন একটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা বলি— এই রোজায় আমরা বন্ধুরা মিলে পুরান ঢাকায় গিয়েছিলাম সেহরি করতে। যেহেতু বেশ অনেকগুলো মানুষ ছিলাম, আমরা উবারে একটা বড় গাড়ি নিয়েছিলাম। ফেরার পথে ফজরের আজান হয়ে যাচ্ছিল। আমাদের ড্রাইভার আমাদের থেকে পানির বোতল চেয়েছে। তো বোতল এগিয়ে দিয়েছি। এরপর সে পানিটা পুরো খেয়ে বোতলটার মুখ আটকে সড়কের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলল। এটা কিন্তু হাঁটার রাস্তা না, হাইওয়ে— গাড়ি চলছে সেখানে।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি কেন রাস্তায় বোতলটা ফেললেন? এবং এটাতে কত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সে নিয়ে তার কোনো ধারণা আছে কি না? উত্তরে তিনি আমাকে কী বললেন জানেন? 'কিছুই নাকি হবে না'। আমি বললাম— 'কিছু হবে কি না জানি না, কিন্তু আপনার রোজাটা কি আদৌ হবে?'
এরকম ঘটনা প্রতিনিয়তই আমাদের চারপাশে ঘটে যাচ্ছে। আমাদের কোনো সিভিক সেন্স নেই।
রাস্তাঘাটে যে যার যেখানে ইচ্ছা যা ইচ্ছা ফেলে দিচ্ছি। আমাদের নদী-সমুদ্রের দিকে তাকালে আসলে বোঝা যায় যে আমরা জাতি হিসেবে কেমন। আমরা নিজেরা সুযোগ পেলে নিয়ম ভাঙি, মিথ্যে বলি, অন্যায় সুবিধা নেই, দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করে ফেলি; তারপর সরকারের কাছে শতভাগ সততা প্রত্যাশা করি। এ কথার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রের এতে দায় কমে যায়। রাষ্ট্রের দায় অবশ্যই সবথেকে বেশি, কিন্তু নাগরিকের দায়ও শূন্য নয়।
আমাদের সমাজের মূল্যবোধ, অসততা, অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতার সংস্কৃতি একসময় রাষ্ট্রের ভেতরে প্রতিফলিত হয়।
তাই নতুন বাংলাদেশ শুধু নতুন সরকার দিয়ে তৈরি হবে না; নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নতুন নাগরিক নৈতিকতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা দিয়ে। নতুন
বাংলাদেশ মানে নতুন শত্রুর তালিকা নয়, নতুন বাংলাদেশ মানে পুরনো সহিষ্ণুতার সঙ্গে নতুন স্লোগান জুড়ে দেওয়া নয়। জুলাইকে সম্মান করতে হলে জুলাইয়ের নামে মঞ্চ বানালেই যথেষ্ট নয়। আপনি জুলাইকে সম্মান করার দাবি করতে পারেন না যদি জুলাইয়ের মঞ্চে একজন শিল্পীকে অপমানিত হতে হয়। এবং আপনি নতুন বাংলাদেশের কথা বলতে পারেন না যদি আপনার আচরণে পুরনো বাংলাদেশের ভয়, প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা ফিরে আসে এবং মব সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়।"
__ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।


মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন