মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
নির্বাচিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের হাতে যথেষ্ট অর্থের যোগান নেই। বিদ্যুৎ পাওয়ার প্ল্যান্ট চালাতে যথেষ্ট জ্বালানিও নেই। তবে সরকার দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেবে না।"
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের এই কথাগুলো শুনতে শুনতে দেশের মানুষ এখন হাঁপিয়ে উঠেছে। কারণ, কথা শোনা আর বাস্তবতা দেখা — দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। যখন মন্ত্রী মহোদয় বলছেন "দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেবে না," তখন দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রশ্ন, তবে কি দেশের মানুষকেই বিকিয়ে দেওয়া হচ্ছে?
বিদ্যুৎ নেই। জ্বালানি নেই। অর্থ নেই। কিন্তু মন্ত্রী আছেন, মন্ত্রণালয় আছে, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আদায়ের যন্ত্র আছে।
একটা সময় ছিল যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিদ্যুতের খাম্বা চোর বলে আখ্যায়িত করা হতো। সেই আখ্যা কতটা সত্য ছিল বা মিথ্যা ছিল, তা ইতিহাসের বিচারে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু আজ যে বাস্তবতার মুখোমুখি এই দেশ, তা আরও ভয়াবহ। খাম্বা চোরের দিন শেষ; এখন বিল চোরের যুগ।
পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছেন না, এ কথা স্বীকার করছেন মন্ত্রী। কিন্তু তার মধ্যেই গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত, অস্বাভাবিক, কখনো কখনো "ভুতুড়ে" বিল আদায় করা হচ্ছে। এ কী ধরনের ন্যায়বিচার? এ কী ধরনের শাসন? বিদ্যুৎ দাও না, কিন্তু টাকা নাও — এটা কি সরাসরি লুটপাট নয়?
বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকট, এলএনজি আমদানি ব্যাহত, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৩০ হাজার কোটি টাকা। তারা জ্বালানি কিনতে পারছে না। অর্থাৎ, পুরো খাতটাই একটা অর্থনৈতিক ধ্বসের মুখে। কিন্তু এই ধ্বসের দায় কি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়? বিদ্যুৎ না দিয়ে বিল আদায় করে কি এই সংকট মোকাবেলা করা যায়?
না, যায় না। যা হয়, তা হলো জনগণের ওপর চরম অন্যায়। যা হয়, তা হলো ভোক্তা অধিকারের লঙ্ঘন। যা হয়, তা হলো একধরনের প্রতারণা।
মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, "দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেবে না।" কিন্তু দেশের মানুষ যখন অসহ্য গরমে ঘামে ভিজে, যখন ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে শ্রমিক বেকার হয়, যখন কৃষক পানি না পেয়ে ফসল হারায়, যখন ছাত্র-ছাত্রীরা অন্ধকারে পড়াশোনা করে — তখন দেশের স্বার্থ কোথায়? কোন স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে? সরকারের স্বার্থ, না জনগণের স্বার্থ?
একটা কথা স্পষ্ট করে বলা দরকার,ক্ষমতায় থাকা মানে এই নয় যে জনগণকে যা ইচ্ছা তাই করা যাবে। বিদ্যুৎ একটা মৌলিক চাহিদা। এটা কোনো বিলাসিতা নয়। আর যখন সেই মৌলিক চাহিদা পূরণ করা যায় না, তখন কমপক্ষে জনগণের পকেট কাটা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু উল্টোটা হচ্ছে। বিদ্যুৎ কম দেওয়া হচ্ছে, বেশি বিল ধরা হচ্ছে। এটা কি কোনোভাবে ন্যায়সঙ্গত?
আমরা জানি, এই সরকারের কাছে "অর্থের যোগান" নেই। কিন্তু আমরাও জানি, একই সরকারের কাছে অন্যান্য খাতে অর্থের কোনো সংকট নেই। প্রশ্ন হলো, অগ্রাধিকার কোথায়? বিদ্যুৎ ও জ্বালানি না, বড় বড় প্রকল্পে? জনগণের দৈনন্দিন জীবন না, কোনো প্রতীকী স্থাপনায়?
আমরা মনে করি, এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সত্যিকারের জবাবদিহিতা। বিদ্যুৎ বিলের যে অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। যারা এই অন্যায়ের সাথে জড়িত, তাদের শাস্তি দিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের কাছে স্পষ্ট করে বলতে হবে — কবে নাগাদ এই সংকটের অবসান হবে, কীভাবে হবে, আর তার জন্য কী পরিকল্পনা আছে।
কথায় কথায় "দেশের স্বার্থ" রক্ষার কথা বলা সহজ। কিন্তু যখন দেশের মানুষই অতিষ্ঠ, তখন সেই স্বার্থ একটা ফাঁপা স্লোগান ছাড়া আর কিছুই নয়।
খাম্বা চোরের সময় শেষ। এখন বিল চোরের দিন। আর এই দিন কতদিন চলবে, তা নির্ভর করছে জনগণ কতদিন সহ্য করবে, আর সরকার কতদিন চোখ বন্ধ করে রাখবে।
___ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।


মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন