নিউজ ডেস্ক :
কুমিল্লায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫, পানিবন্দি ১২ লাখ মানুষ
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লায় গোমতী নদীর পানি বেড়ে বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের বুরবুরিয়া গ্রামে বাঁধ ভেঙে ও ফেনীর বন্যার পানি এসে কুমিল্লার জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১৪টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। ফলে জেলাজুড়ে প্রায় ১২ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। এখন পর্যন্ত জেলায় বন্যার পানিতে ১৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লায় বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বুড়িচং উপজেলায় শিশুসহ চার জন, তিতাসে দুজন, নাঙ্গলকোটে তিন জন, লাকসামে তিন জন, মুরাদনগর, মনোহরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণপাড়ায় ১ জন করে মারা গেছেন।
স্থানীয়রা জানান, গত ২২ আগস্ট রাতে বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের বুরবুরিয়া গ্রামে গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। এতে পানিতে তলিয়ে যায় বুড়িচং উপজেলার ১০৫টি গ্রাম। বুড়িচংয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এরপর একে একে প্লাবিত হতে থাকে গ্রামের পর গ্রাম। সেই পানি ব্রাহ্মণপাড়া ও দেবীদ্বার উপজেলায় ছড়িয়ে বেশিরভাগ গ্রাম ডুবে গেছে। গোমতীর পানিতে তলিয়ে যায় ব্রাহ্মণপাড়ার ৮টি ইউনিয়ন। যেখানে ৬০টি গ্রামের প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে যায়। এছাড়া দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নসহ তিনটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। দেবীদ্বারে ৫০টি গ্রামে লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
এদিকে মুহুরি নদীর পানিতে ডুবেছে ফেনী। ফেনীর বন্যার পানিতে ডুবেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট ও বরুড়া উপজেলার বেশিরভাগ অংশ। কুমিল্লা নগর উপজেলার প্রায় ৩০০ গ্রাম পানিতে চলে গেছে এতে প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত নাঙ্গলকোট উপজেলায় তিনজনে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। কুমিল্লা মনোহরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টি ইউনিয়নই এখন প্লাবিত। ওই উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। মনোহরগঞ্জে বন্যায় এক জন মারা গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় ফেনীর বন্যার প্রভাবে ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছিল। এ সময় প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় ছিল। তবে গত ২ দিন ধরে পানি কমায় বর্তমানে ৬টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে পানিবন্দি অবস্থায় ছিল। তবে বন্যা পরিস্থিতি বর্তমানে উন্নীত হওয়ায় অনেক গ্রাম থেকে পানি নেমে গেছে। বর্তমানে ১০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। বন্যায় তিতাস উপজেলায় ২ শিশু মারা গেছে।
কুমিল্লা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবেদ আলী সময় সংবাদকে জানান, কুমিল্লা জেলাজুড়ে ১২৫টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে ২ লক্ষাধিক পরিবার। জেলাজুড়ে ৭২৪টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ও বন্যায় পানিবন্দিদের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত বয়স্ক ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার জন্য ২০৭টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আইয়ূব মাহমুদ সময় সংবাদকে বলেন, বন্যায় জেলাজুড়ে ৬৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানি নিচে প্লাবিত হয়েছে। যেহেতু এখনও অনেক এলাকায় পানি ঢুকছে সেহেতু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। বন্যার পানি কমার পর সঠিক তথ্য জানা যাবে কী পরিমাণ ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বেলাল আহমেদ সময় সংবাদকে বলেন, কুমিল্লা জেলা জুড়ে বন্যা কবলিত এলাকায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চন্দন কুমার পোদ্দার সময় সংবাদকে বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি জেলা জুড়ে গবাদিপশুর খামার ৪১৯২টি বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। গরু মারা গেছে ৩৩টি, মহিষ মারা গেছে ৩টি, ছাগল ১৬৯টি এবং মুরগি মারা গেছে ১০ লাখ ২১ হাজার ৩৪২টি। সব মিলিয়ে ৩০৯ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। বন্যার পানি কমলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।


মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন