জুলহাস আহমেদ, বরগুনা প্রতিনিধি :
নিখোঁজের দুইদিন পর গৃহবধূ সুখীর মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ, এঘটনার দীর্ঘ নয় মাসেরও অধিক সময় অতিবাহিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দখিল না হওয়ায় ন্যায় বিচার নিয়ে চিন্তিত আলোচিত গৃহবধূ সূখী হত্যা মামলার বাদী ও নিহত সুখীর মা ফাতেমা বেগম। এদিকে মামলার তদন্তের কাজ চলমান থাকায় এখনো আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন বরগুনা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বশিরুল আলম।
শুক্রবার (২৯ নভেম্বর) দুপুরে ছোটবগী ইউনিয়নের গেন্ডামারা গ্রামের নিহত সূখীর বাবার বাড়ীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলোমেলো চুলে মেয়ের কিছু পুরনো কাপড়-চোপড় বুকে জড়িয়ে সূখীর কবরের পাশে বসে আছেন নিহত সুখীর মা ফাতেমা বেগম। মেয়ে হারানোর শোক বুকে নিয়ে বিচারের অপেক্ষা আর বুকের মানিককে হত্যাকারীদের প্রতি অসম্ভব ঘৃনা নিয়ে প্রায় সময়ই পুকুর পাড়ে অনন্তকালের ঘুমিয়ে থাকা মেয়ের কবরের দিকে নির্বাক চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন আর অনবরত ফেলতে থাকেন চোখের জল।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারী ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে মেয়েকে হত্যার অভিযোগে অজ্ঞাতনামা আসামী করে তালতলী থানায় একটি এজাহারের দরখাস্ত দায়ের করেন। পরে তালতলী থানার ওই সময়ে কর্মরত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম খান মিলন দরখাস্তটি গ্রহণ করে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করে আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে প্রেরণ করেন।আদালত মামলটি বরগুনা জেলা গোয়েন্দা শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি ডিবি) বশিরুল আলমকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন। ডিবি'র ওসি বশিরুল আলম মামলাটির তদন্তের জন্য প্রথমে ডিবির উপ-সহকারী পরিদর্শক মোশারফ হোসেনের উপর দ্বায়িত্বভার অর্পণ করেন। তবে, মোশারফ হোসেনের বদলি জনিত কারণে পরবর্তীতে বরগুনা ডিবি পুলিশের উপ-সহকারী পরিদর্শক ইমাম হোসেনকে তদন্তের দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়।
মামলার বাদী নিহত গৃহবধূ সুখী'র মা ফাতেমা বেগম বলেন, হাসান মাদকে আসক্ত, বিক্রিও করতো। এ নিয়ে সুখীর সাথে প্রায়ই ঝগড়াঝাঁটি হতো। আমার মেয়েকে আমার বাড়িতে আসতে দিতো না। একদিন সন্ধ্যায় আমাকে ফোন দিয়ে বলে যে, সুখীকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সাথে সাথে ওরাও খোঁজে সুখীকে। দুইদিন পরে সুখীর মরদেহ পাইয়া, থানায় মামলা করি। ওরা পুলিশের কাছে সব স্বীকার করছে। এখন উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাইরে বের হইছে। ওরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন লোক দিয়ে আমাকে হয়রানি করেছে। কয়েকদিন পর পর বরগুনা যাই, বার বার ডিবি অফিসে যাই। এখনো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হয় নাই। আসামীদের নানা কৌশল ও প্রলোভনে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও তদন্তের কাজ শেষ না হওয়ায় তদন্ত সঠিক প্রতিবেদন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মেয়ে হত্যার ন্যায় বিচার চাইতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পরেন ফাতেমা বেগম। এসময় তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্তের কাজ শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেন তিনি।
নিহত গৃহবধূ সূখী'র স্বামী হাসান সরদারের এলাকার কয়েকজনের সাথে কথা হলে নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, থানায় পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেওয়া কথা আমারও কমবেশি শুনেছি। তবে অপরাধী যেই হোক আমরাও বিচার চাই।
মামলার এজাহার ও আদালতের কাগজ পত্রের বরাতে জানা গেছে, নিখোঁজের দুইদিন পর চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারী স্বামী হাসান সরদারের বাড়ীর ১০০-১৫০ গজ উত্তরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের ঢালে নিহত গৃহবধূ সূখীর মরদেহ দেখতে পায় স্থানীয়রা,পরে খবর পেয়ে সুখীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের পরই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে নিহত সুখীর স্বামী হাসান সরদার, শ্বশুর সাইফুল সরদার, শ্বাশুড়ী ময়না ও চাচাতো দেবর আব্দুল্লাহকে থানা হেফাজতে নেয় পুলিশ।
থানা হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে হাসান, সাইফুল, ময়না ও আবদুল্লাহ হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে বলে দাবী করে তালতলী থানা পুলিশ।
স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে উপরে উল্লেখিত ৪জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত ৩ ফেব্রুয়ারী আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রট আদালতে সোপর্দ করলে ৪জনকেই জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। বর্তমানে ৪জনই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছে।
বরগুনা জেলা গোয়েন্দা শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বশিরুল আলম বলেন, বেরি বাঁধের পাশে সুখীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল। এঘটনায় সুখীর স্বামী, শশুর, শাশুড়ীসহ ৪জন গ্রেপ্তার হয়েছিল। মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের কাজ চলমান আছে। এস আই ইমাম তদন্তের দ্বায়িত্বে আছে, প্রতিবেদন জমা দিতে আরো দেরী হবে বলে জানান তিনি।


মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন