মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মুখোশে সন্ত্রাস, এনসিপির রাজনীতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করেছিল, সেই রক্তস্নাত ইতিহাস আজ বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক কৌশল, ক্ষমতালিপ্সা ও জঙ্গিবাদের ছায়ায় কলঙ্কিত হতে বসেছে। এ সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদী স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিক্রিয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা এবং 'বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন' ও 'জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)' নামের নবোদিত কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত শক্তির উত্থান।
২০২৪ সালের আন্দোলন নিঃসন্দেহে ছিল জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, দুঃখ ও বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দমন-পীড়ন, গুম-খুন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক অমানবিকতার বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরণ ঘটেছে। ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের দাবি ছিল সত্য; কিন্তু সেই দাবির পেছনে যেভাবে জঙ্গি শক্তি ও অপ্রস্তুত শিশু রাজনীতি ঢুকে পড়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ড. ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে জনগণ এক স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ড. ইউনুস জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিজের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা খালাস করে নেওয়া, গ্রামীণ ব্যাংকের ২৬% সরকারি মালিকানা থেকে ১০% নামিয়ে আনা এবং কর ফাঁকির অভিযোগ থেকে নিস্কৃতি লাভ – এসব তার 'অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের' স্বার্থান্বেষী দিক উন্মোচন করেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, ড. ইউনুস বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপির মতো দলীয় পরিচয়হীন, গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সদা তৎপর শক্তিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন, যেখানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, যেমন জাতীয় পার্টিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। জাতীয় পার্টি সংবিধান মেনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে – এটাই কি তাদের অপরাধ? তাহলে যারা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য হিসেবে জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত, তারা কিভাবে জাতীয় ঐক্যের আলোচনায় বসে? তারা কারা, এবং কে তাদের এ বৈধতা দিয়েছে?
জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি এখনো নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত কোনো দল নয়। এরা মূলত ছাত্ররাজনীতির মুখোশ পরে সন্ত্রাস, মব গঠন, লুটপাট ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ করছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এনসিপি ও তথাকথিত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিচয়ে তারা সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িতে হামলা চালাচ্ছে, ব্যবসায়ীদের হুমকি দিচ্ছে। এরা আসলে কোন শ্রেণির ছাত্র? এই প্রশ্ন আজ জাতির সামনে!
রংপুরে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সফল রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পৈতৃক বাসভবন 'দি স্কাই ভিউ'তে হামলা চালিয়ে এরা বুঝিয়ে দিয়েছে— এদের টার্গেট শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি ধ্বংস করা। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, একজন পরিপক্ব, শান্ত, ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক, তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে মেতেছে এনসিপি ও তাদের জঙ্গি মদদদাতা গোষ্ঠী।
বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কটের মূল উৎস 'বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন' নামের অপব্যবহৃত ট্যাগ এবং এনসিপির মতো রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের উত্থান। এই সংগঠনগুলোকে এখনই নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। জনগণকে আবার রাস্তায় নামতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে, এ দেশকে একটি সন্ত্রাসমুক্ত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে হবে।
এখন সময় এসেছে জেগে ওঠার। সন্ত্রাস নয়, রাজনীতি হোক গণমানুষের প্রতিনিধি। এনসিপি নয়, চাই গণতন্ত্রের ধারায় বৈধ, নিবন্ধিত রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব। জাতীয় পার্টির মতো সংবিধান-সম্মত দলের প্রতিই আস্থা রাখা এখন জাতীয় স্বার্থে জরুরি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি'র সন্ত্রাসী উত্থানের বিপদে বাংলাদেশ
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মতো সংগঠনের উত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে এই সংগঠনটি জনমানসে ভয়, বিভ্রান্তি এবং বিভাজন সৃষ্টি করছে। দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
বিশেষ করে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস যদি এনসিপির মতো সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হন, তবে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখতে সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকে আজই প্রতিহত করতে হবে। নচেত, আগামী দিনে এই দেশ অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
_ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও কলামিস্ট।


মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন