Raju Ahmed :
রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু যখন সেই রাষ্ট্রই তার আইনি কাঠামোকে ব্যবহার করে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—আইন কি ন্যায়ের জন্য, নাকি ভয়ের জন্য?
১৯৭৪ সালের "বিশেষ ক্ষমতা আইন"—যার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম, অন্তর্ঘাত ও জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ—আজ অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষত, ১৫(৩) ধারার মতো গুরুতর অভিযোগ, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে, তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নিরপেক্ষতা প্রত্যাশিত।
এই ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—কোনো ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ক্ষতি বা কার্যক্ষমতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যদি কোনো ব্যক্তি এই অপরাধে জড়িত না থাকেন, তবে কি শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে তাকে এই আইনের আওতায় আনা যায়?
সম্প্রতি ভালুকা থানার অধীনস্থ হবির বাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা মৃত: জালালউদ্দিন এর ছেলে মোঃ রেজাউল করিম বাবু সরকার (৩৮) এর ঘটনাটি সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে—একজন নিরপরাধ মানুষকে শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(৩) ধারায় ভালুকা থানার ওসি আদালতে প্রেরণ করেছে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অন্যায় নয়—বরং ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি এক গভীর আঘাত।
আইন কখনোই অন্ধ হওয়ার কথা নয়; বরং তার চোখ হওয়া উচিত প্রমাণ, যুক্তি ও ন্যায়ের আলোয় উন্মুক্ত। কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী সাব্যস্ত করার আগে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা আবশ্যক। অন্যথায়, এই ধরনের কঠোর আইন ব্যবহারের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানো হলে, তা হবে আইনের চরম অপব্যবহার।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—প্রশাসন যদি নিজেই আইনের সীমা লঙ্ঘন করে, তবে সাধারণ মানুষ আশ্রয় খুঁজবে কোথায়?
আইন যদি সুরক্ষা না দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তবে তা সমাজে অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও অস্থিরতা বাড়াবে।
অতএব, এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত জরুরি। যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো ধরনের অপপ্রয়োগ হয়েছে, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে, ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সেজন্য আইনের প্রয়োগে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
আইনকে শক্তিশালী করা মানে তার অপব্যবহার নয়—বরং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।
রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তার প্রতিটি নাগরিক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা অনুভব করে।
__ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।


মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন