নিউজ ডেস্ক :
১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধের বছর, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও দেশবাসীর ঈদ উদযাপন ছিল এক অভাবনীয়, বেদনাদায়ক অধ্যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোদ্ধা রাজাকারদের হাতে বহু মানুষের জীবন বিপন্ন ছিল, এবং বিশেষত ঈদের দিন, যেদিন সাধারণত আনন্দ আর উৎসবের অনুভূতি থাকে, সেদিনও যুদ্ধের তীব্রতা ছিল।
ঈদের দিন মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ
ঈদুল ফিতরের দিনটি ১৯৭১ সালে ছিল ২০ নভেম্বর, যেদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ চলছিল। অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, কিছু আহত হন, এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এই সময়কার অনেক বাঙালি পরিবারে ঈদের কোনো আয়োজন ছিল না, বরং তারা যুদ্ধের জন্য সংগ্রামী মনোভাব নিয়েই এই দিনটি পার করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাণী
মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঈদের বাণীতে বলেছিলেন,
"আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। শত্রুসৈন্যের তাণ্ডব চলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়েছেন। মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। আমরা মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে আজ লিপ্ত, আমাদের সংগ্রামের সাফল্য খুব কাছেই।"
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঈদের বাণী
১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর, "জয় বাংলা" পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঈদের বাণী প্রকাশিত হয়েছিল। এতে তিনি বলেন,
"এবারের ঈদ উৎসবের ঈদ নয়, ত্যাগের ঈদ। আমরা বাঙালি হিসেবে একতাবদ্ধ, এবং এই ঐক্য আমাদের স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।"
কীভাবে ঈদ পালন হয়েছিল
যুদ্ধকালীন সময়ে ঈদের জামাত কিংবা পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করার সুযোগ ছিল না। যুদ্ধের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের দুঃখ ও শোককে জয় করে ঈদ পালন করেছিলেন, অনেক সময় নিজেদের সহযোদ্ধাদের জন্য খাবারের আয়োজনও করেছেন।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর ডায়েরিতে উল্লেখ করেন, "আজ ঈদ, কিন্তু কোনো আয়োজন নেই। বাড়িতে আতর, নতুন জামাকাপড় কিছুই নেই, তবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছি।"
ঈদের দিন মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধাদের আত্মদান
ঈদের দিন ১৯৭১ সালে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আত্মাহুতি দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ বীর উত্তম, যিনি রায়গঞ্জের যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর সাহস ও আত্মত্যাগ আজও আমাদের হৃদয়ে চিরকালী হয়ে আছে।
শেষ কথা
যুদ্ধের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বাঙালি জাতির সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের শক্তি তাদের ঈদ উদযাপনের সঠিক অর্থ তৈরি করেছিল। এই ঈদ ছিল শুধু সংগ্রামের ঈদ, ছিল শোক, কিন্তু ছিল স্বপ্নেরও ঈদ—এক স্বাধীন বাংলাদেশের ঈদ।
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন