Super Admin :
প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের সভ্যতা পরিমাপ করা যায় তার আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মানের মাধ্যমে। যে সমাজে অপরাধের বিচার আদালতে হয়, সেই সমাজ সভ্যতার পথে এগিয়ে যায়। আর যে সমাজে জনতা বিচারকের ভূমিকা নিতে শুরু করে, সেখানে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা ও ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমরা প্রায়ই বিভিন্ন অপরাধের কথা শুনি—মাদক ব্যবসা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, কালোবাজারি কিংবা অন্যান্য অসামাজিক কর্মকাণ্ড। এসব অপরাধ নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য ক্ষতিকর এবং অপরাধীদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। কিন্তু একজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে আমরা কি নিজেরাই অপরাধী হয়ে উঠছি না?
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত হলেই কিছু মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই শুরু হচ্ছে মারধর, অপমান, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, সম্পদ লুটপাট কিংবা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার প্রতিযোগিতা। অথচ এই ধরনের কর্মকাণ্ড নিজেরাই একটি গুরুতর অপরাধ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার শিকার শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তি নয়; তার পরিবারের নিরপরাধ সদস্যরাও এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করে। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা তো অপরাধী নয়। কিন্তু ঘরবাড়ি ভাঙচুর, সম্পদ লুটপাট কিংবা অগ্নিসংযোগের ফলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি পরিবারের একমাত্র আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়ে গেলে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে না। পরিবারের শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হয়, নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, বৃদ্ধরা অসহায় হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের জীবনও হুমকির মুখে পড়ে। ফলে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার নামে পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের চোখে অপরাধী নন। আর অপরাধ প্রমাণিত হলেও তার বিচার করার অধিকার আদালতের। কারণ আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো—বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, আবেগ বা জনরোষের ভিত্তিতে নয়।
যখন কেউ অপরাধ দমনের নামে অন্যের বাড়িঘর ভাঙচুর করে, সম্পদ লুটপাট করে কিংবা শারীরিক নির্যাতন চালায়, তখন সে নিজেও আইনের দৃষ্টিতে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কারণ ন্যায়বিচারের নামে অন্যায় কখনো ন্যায়বিচার হতে পারে না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের দায়িত্ব হলো অপরাধের তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো, সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে তদন্তে সহযোগিতা করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা। কিন্তু বিচারক সেজে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা নয়।
আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। কারণ জনতার রোষ সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বরং এর মাধ্যমে নতুন অপরাধ, নতুন প্রতিশোধ এবং নতুন সংঘাতের জন্ম হয়।
তাই আসুন, অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিই, কিন্তু আইনের সীমারেখা অতিক্রম না করে। কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করি, বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখি। কারণ সভ্য সমাজের পরিচয় প্রতিশোধে নয়, ন্যায়বিচারে।
মনে রাখতে হবে—অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের; কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। একজন অপরাধীর বিচার করতে গিয়ে যদি আমরা আরেকটি অপরাধ সংঘটিত করি, তবে ন্যায়বিচার নয়, কেবল অন্যায়েরই বিস্তার ঘটবে।
__ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন