Super Admin :
__মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
৪ জুলাই, ২০২৬। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হলো। অত্যন্ত জমকালো আয়োজনে পালিত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস বা 'ফ্রিডম ২৫০'। আলোকসজ্জা, সংগীত আর উৎসবের আমেজে মুখরিত ছিল সেই চত্বর, যা আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কিন্তু এই উৎসবের আড়ালে যে প্রশ্নগুলো আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যে সংসদের চত্বরে খোদ এদেশের সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশাধিকার নেই, যেখানে কড়া নিরাপত্তা আর বিধিনিষেধের বেড়াজালে জনগণের প্রতিনিধি ছাড়া অন্য কারো ছায়া মাড়ানো দায়, সেখানে একটি বিদেশি রাষ্ট্রের জাতীয় উৎসব পালনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো? এটি কি নিছকই কূটনৈতিক সৌজন্য, নাকি আমাদের সার্বভৌমত্বের এক চরম অবমাননা?
সম্প্রতি সংসদে গঠিত হয়েছে 'আমেরিকা ককাস'। আপাতদৃষ্টিতে একে দুই দেশের সংসদীয় সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যম মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে ভিন্ন এক সমীকরণ। প্রথাগত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে কীভাবে এই লবিস্ট গ্রুপগুলো সরাসরি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করছে, তা আজ উদ্বেগের বিষয়। যখন একটি দেশের নীতিনির্ধারকরা প্রথাগত কূটনৈতিক চ্যানেল বাদ দিয়ে লবিস্টদের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তখন বুঝতে হবে সেই দেশের পররাষ্ট্রনীতি আর জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে চলছে না, বরং তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পর্দার অন্তরালের কোনো শক্তির দ্বারা।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এমন লবিস্ট গ্রুপ বা ককাস তৈরি করে। এদের মূল লক্ষ্য থাকে সেই দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে নিজেদের বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ আদায় করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটছে না। যখন আমাদের জাতীয় সংসদ চত্বরকে বিদেশি উৎসবের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তখন তা আন্তর্জাতিক মহলে এক ভুল বার্তা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জাতীয় মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বকে বাজি ধরতেও দ্বিধাবোধ করছে না।
সমালোচকদের মতে, ক্ষমতায় থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যখন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন দেশ বিক্রয় করার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতেও শাসকগোষ্ঠী পিছপা হয় না। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের হৃদপিণ্ড যেখানে স্পন্দিত হয়, সেই সংসদ ভবনকে একটি বিদেশি রাষ্ট্রের উৎসবের মাঠে পরিণত করা কি আমাদের জাতীয় অসম্মান নয়? লবিস্ট গ্রুপগুলোর মাধ্যমে পরাশক্তির তুষ্টি অর্জন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এতে যেমন আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়ছে।
পরিশেষে বলতে হয়, বন্ধুত্ব আর দাসত্ব এক জিনিস নয়। কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। নিজের দেশের মানুষকে দূরে সরিয়ে রেখে বিদেশিদের জন্য সংসদের আঙিনা সাজানো কোনোভাবেই দেশপ্রেমের পরিচয় হতে পারে না। লবিস্টদের হাত থেকে সার্বভৌমত্বকে মুক্ত করে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ইতিহাসের পাতায় আমরা কেবল এক 'পরনির্ভরশীল' রাষ্ট্র হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকব।
মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন