Super Admin :
বাংলাদেশ আজ এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে যে নতুন ভোরের স্বপ্ন এদেশের মানুষ দেখেছিল, তা আজ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কালো মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে, আর এর মাঝেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির এক ভয়াবহ সংস্কৃতি। আইনের শাসন যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাজপথের উন্মত্ত জনতা যখন নিজেই বিচারক হয়ে ওঠে, তখন সেই সমাজ আর সভ্য থাকে না। অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ আজ এই মব কালচারের শিকার হচ্ছে, যা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে চরম মেরুকরণ ও অসহিষ্ণুতা। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া এবং জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান করার ঘটনাগুলো বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু শক্তির জোরে কোনো পক্ষকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে হিতে বিপরীত হতে পারে। অন্যদিকে, বিএনপি বর্তমানে ক্ষমতায় থাকলেও তারা মব জাস্টিস বা এই বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। সরকারি দল হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব, যেখানে আরও কঠোর ও সুসংহত ভূমিকার প্রয়োজন ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় অস্থিরতা। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে রাজনীতির মাঠে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠছে, তারা সুকৌশলে দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। এর পাশাপাশি এনসিপি-র মতো নতুন ও উগ্রবাদী দলগুলোর উত্থান রাজনীতির মাঠকে আরও জটিল করে তুলছে। তাদের উগ্রপন্থা ও হঠকারী সিদ্ধান্তগুলো তরুণ প্রজন্মের একটি অংশকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে, ভারত থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন রাজনীতির উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই গুঞ্জন একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করছে, অন্যদিকে বর্তমান শাসন ব্যবস্থার জন্য তৈরি করছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ। ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা শঙ্কা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ এক গভীর সংকটের মুখে। এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে সবার আগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মব জাস্টিস বন্ধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙার পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলের সহাবস্থান নিশ্চিত না হলে এবং ধর্মীয় উগ্রবাদকে কঠোর হস্তে দমন না করলে অর্জিত বিপ্লব নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো শান্তি আনে না; বরং তা দেশকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এখন সময় জাতীয় ঐক্যের এবং ধৈর্যশীল রাজনীতির।
মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন