মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন অন্তর্বর্তী হাতে, তখন তার প্রধান দায়িত্ব হয় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জনগণনির্ভর একটি নির্বাচনের আয়োজন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড দেখে প্রশ্ন জাগে, এরা আদৌ নির্বাচন করতে চায়, নাকি ক্ষমতাকে একটি দুর্দান্ত ছত্রছায়ার নিচে এনে দীর্ঘায়িত করতে চায়?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত এই সরকার শুরুতে জাতির কাছে নতুন আশার বাতি হয়ে এসেছিল। কিন্তু আজ তা পরিণত হয়েছে এক ধরনের আত্মম্ভরী, পরাশক্তি-নির্ভর, অভ্যন্তরীণ বিভাজন-চালিত প্রশাসনিক কাঠামোতে। সর্বশেষ সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে—"অর্পিত দায়িত্ব পালন অসম্ভব হলে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।"
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ‘জনগণ’ কোথায়? জনগণ কি সেই এনসিপি, যারা জনগণের ভোটে নয় বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেনা সমর্থন পেয়ে গজিয়ে উঠেছে? জনগণ কি সেই রাজনৈতিক সংগঠন, যাদের নাম নেই নিবন্ধনে, শিকড় নেই মাটিতে? মূল রাজনৈতিক শক্তিগুলো—বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বাম দল, ইসলামপন্থীরা—যারা জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের বাদ দিয়ে কীভাবে জাতির পক্ষ থেকে ‘প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত’ গ্রহণ করা হয়?
আসলে এটি একটি প্রতারণা। এটি হচ্ছে, চোরকে বলা—"তুমি আমাকে ভাগ না দিলে আমি বলে দেবো।" ড. ইউনূস ঠিক সেই শিশুতোষ কৌশলে এখন রাষ্ট্রকে জিম্মি করে বলেছেন, "আমাকে কাজ করতে না দিলে, আমি জনগণের কাছে সব ফাঁস করে দেব।"
এটা কেবল শিশুসুলভ নয়, এটা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের চরম অপব্যবহার। এমন একজন ব্যক্তি, যিনি রাষ্ট্রের প্রধান উপদেষ্টা, তিনিই যদি এই ভাষায় কথা বলেন, তবে তা স্পষ্টতই বোঝায় যে তিনি এখন আর নিষ্কলুষ নন, তিনি এখন পক্ষপাতদুষ্ট। এমনকি তিনি নিজের ঘোষিত তিনটি লক্ষ্য—সংস্কার, নির্বাচন, বিচার—সবগুলোতেই ব্যর্থ। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নির্ধারণ করতে গিয়ে তিনি কেবল ‘শ্বেতসন্ত্রাস’ এবং ‘অরাজনৈতিক পরাশক্তি নির্ভর খেলায়’ মত্ত।
আলজাজিরা সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে, এই সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যভঙ্গ, সেনাবাহিনীর সঙ্গে দূরত্ব, বিদেশি স্বার্থ রক্ষায় নতজানু চুক্তি, এবং ‘উন্নয়ন’ নামের অধিকার-গ্রাসের ধারা প্রতিষ্ঠার অভিযোগ বাড়ছে। বিশেষ করে সেনাপ্রধানের উদ্বেগ—নির্বাচনের সময়সীমা লঙ্ঘন, সমুদ্রবন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা কিংবা স্টারলিংকের মত বিদেশি কনট্রোল সিস্টেম চালু করা—এগুলো সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ।
অথচ এসব বিষয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো মতামত নেয়া হচ্ছে না। তারা সংলাপের বাইরে, সিদ্ধান্তের বাইরে, অথচ ভোট চাইলে এই জনগণের কাছেই যাবে? এ কেমন গণতন্ত্রের খেলা?
আজকের বাস্তবতায় দেশের মানুষ চায়, একটি নিরপেক্ষ, স্বল্পমেয়াদী, সর্বদলীয় সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থাপনায় আসুক। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হোক নির্বাচন আয়োজন, নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি নয়। আর সেই নির্বাচন হোক সর্বজনগ্রাহ্য এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরপেক্ষ।
তাই এখনই সময়, দেশের মানুষকে বুঝে নিতে হবে—ড. ইউনূস কোনো মধ্যস্থতাকারী নন, তিনি এখন আর নিরপেক্ষও নন। তিনি একজন রাজনৈতিক খেলোয়াড়, যিনি ক্ষমতার দীর্ঘায়ন ও নিজস্ব গোষ্ঠী তৈরি করতেই অধিক আগ্রহী।
এখন প্রয়োজন—সত্যিকার গণজাগরণ। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে অবজ্ঞা করে, জনগণের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করে, দেশে আর কোনো ‘সমঝোতা নাটক’ চলতে দেয়া যায় না।
— মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন