ঢাকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
প্রকাশিত : ০৮:৫৫ পিএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Digital Solutions Ltd

বাংলাদেশের জন্মদিন, ইতিহাস ও অন্তর্বর্তীকালীন বিতর্ক: একটি জাতির স্মৃতি কি পুনর্লিখন করা যায়?



প্রকাশিত : ০৮:৫৫ পিএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ, লেখক ও কলামিস্ট।



মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ—এই তারিখটি শুধু একটি ক্যালেন্ডারের দিন নয়, এটি একটি জাতির জন্মঘণ্টা। দীর্ঘ সংগ্রাম, রক্ত, ত্যাগ ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বা সাময়িক প্রশাসনিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়।

 

কিন্তু সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বক্তব্য—“আজ বাংলাদেশের প্রথম জন্মদিন”—একটি গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে এমন মন্তব্য শুধু বিতর্কিতই নয়, এটি জাতীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির প্রতি অবমাননাকর বলেও অনেকের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

রাষ্ট্রের জন্ম বনাম সরকারের জন্ম

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রের জন্ম ঘটে ইতিহাসের নির্দিষ্ট এক সন্ধিক্ষণে—যখন জনগণ, ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব ও স্বীকৃতি অর্জিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই জন্ম ১৯৭১ সালেই সংঘটিত হয়েছে।

 

সরকার পরিবর্তন হতে পারে, প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে পারে, এমনকি সংবিধান সংশোধিত হতে পারে—কিন্তু রাষ্ট্রের জন্মদিন বদলে যায় না।

 

এই বাস্তবতা অস্বীকার করা হলে তা কেবল ঐতিহাসিক ভুল নয়, বরং জাতীয় পরিচয়ের ওপর আঘাত।

 

ইতিহাস পুনর্লিখনের আশঙ্কা

 

বিশ্ব রাজনীতিতে ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক, জাতীয় দিবস ও প্রতীক পরিবর্তনের উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস পুনর্লিখনের চেষ্টা সাধারণত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হয়—বিশেষ করে অতীতের অপরাধ, গণহত্যা বা সহযোগীদের ভূমিকা আড়াল করার জন্য।

 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত। তাদের পুনর্বাসনের কোনো প্রচেষ্টা শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নেও গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করবে।

 

গণতন্ত্রের নামে স্মৃতি মুছে ফেলা?

 

নির্বাচন গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু নির্বাচন কোনো জাতির ইতিহাসকে বাতিল করতে পারে না। সরকার পরিবর্তন মানেই রাষ্ট্রের জন্ম নতুন করে ঘোষণা—এই ধারণা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 

জনগণের ভোটে সরকার বদলাতে পারে, কিন্তু জনগণের জন্মপরিচয় ও জাতীয় আত্মপরিচয় বদলায় না।

 

আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি

 

আন্তর্জাতিক সমাজ সাধারণত রাষ্ট্রের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকৃতি দেয় এবং সংবিধানগত ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাতিসংঘসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার নথিতে স্বীকৃত। তাই রাষ্ট্রের জন্মদিন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে।

 

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয় একটি সংবেদনশীল বিষয়। বাংলাদেশের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও অশুভ বার্তা দিতে পারে।

 

জাতির দায়িত্ব: ইতিহাস রক্ষা

 

ইতিহাস কোনো সরকারের সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের স্মৃতি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হোক বা নির্বাচিত সরকার—কোনো প্রশাসনেরই অধিকার নেই একটি জাতির জন্মকথা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার।

 

বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে—এই সত্য ইতিহাসের পাতায় যেমন অমোচনীয়, তেমনি বাঙালির জাতিসত্তার গভীরে প্রোথিত।

 

যদি ইতিহাসের ভিত্তি নড়ে যায়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

 

 শেষ কথা:

বাংলাদেশ কোনো প্রশাসনিক পরীক্ষাগার নয়, এটি একটি রক্তে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্র। ইতিহাসের সঙ্গে আপস করা মানে জাতির আত্মার সঙ্গে আপস করা। আর সেই আপস কোনো গণতন্ত্র, কোনো নির্বাচন, কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈধতা দিতে পারে না।

 

__ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ

          লেখক ও কলামিস্ট। 

সম্পাদকীয় বিভাগের অন্যান্য খবর



 Amadersomaj News
Follow Us

শহীদ সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ, ব্লক কে, বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চল, ঢাকা-1212

সম্পাদক
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু

নির্বাহী সম্পাদক
মতিউর রহমান


প্রকাশক
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিমিটেড
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিঃ এর একটি প্রতিষ্ঠান।

নিউজ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com

বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com

DMCA.com Protection Status

©২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |amadersomaj.com