আমি মাঝেমধ্যেই ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন করি— “হোয়াট ডু ইউ মিন বাই আজাদী?”
কারণ ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, আজাদীর ভাষ্য কখনো মুক্তির প্রতিশ্রুতি, আবার কখনো আধিপত্যের সূক্ষ্ম অস্ত্র। ১৯৪৭–এর বিভাজনের পর যে ‘আজাদী’ আমাদের দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল অসম্পূর্ণ—ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দাসত্বে মোড়া এক উপনিবেশিক বাস্তবতা।
রক্তিম আকাশের নিচে ভাঙা শহীদ মিনারের ছবিটি এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তোলে। একটি বিশাল হাত—যার গায়ে লেখা “উর্দু”—চেপে ধরেছে আমাদের স্মৃতির স্তম্ভ, ভাষার স্মৃতিস্তম্ভ, জাতির আত্মপরিচয়ের স্তম্ভ। শহীদ মিনার এখানে কেবল স্থাপনা নয়; এটি ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের রক্তে লেখা বাঙালির প্রথম রাজনৈতিক আত্মঘোষণা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল কেবল ভাষার দাবিতে আন্দোলন নয়—এ ছিল রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও গণমানুষের আত্মসম্মানের প্রথম সংগঠিত বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। ভাষা থেকে রাষ্ট্র, সংস্কৃতি থেকে সার্বভৌমত্ব—এই ধারাবাহিকতা বাঙালির জাতিসত্তার মূল ভিত্তি।
কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আজও কিছু গোষ্ঠী সেই ইতিহাসকে বিকৃত করতে চায়। তারা ৭১–এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আবারও আমাদের ৪৭–এর মানসিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে ফিরিয়ে নিতে চায়। তাদের ভাষায় ‘স্বাধীনতা’ নয়, ‘আজাদী’; ‘সার্বভৌমত্ব’ নয়, ‘ইনকিলাব’; ‘ন্যায়বিচার’ নয়, ‘ইনসাফ’। শব্দ বদলায়, চিন্তা বদলায়; চিন্তা বদলালে রাষ্ট্র বদলায়—এটাই ভাষাগত হেজিমনির মূল রাজনীতি।
ছবির এক পাশে যেসব শব্দ নাকচ করা হয়েছে—‘আজাদী’, ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘মুক্তি’, ‘কওম’—সেগুলো নিছক শব্দ নয়; এগুলো একটি ভিন্ন রাজনৈতিক কল্পনার বাহক। অন্য পাশে টিক চিহ্ন দেওয়া ‘স্বাধীনতা’, ‘বিচার’, ‘সুবিচার’, ‘দেশ’, ‘জাতি’—এই শব্দগুলো মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক অভিধান, নাগরিক জাতির ভাষা, বাঙালির রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি।
এখানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা ক্ষমতার কাঠামো। গ্রামশি যাকে বলেছেন সাংস্কৃতিক হেজিমনি—শব্দ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মাধ্যমে সম্মতি তৈরি করা, রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। যখন কেউ মুক্তিযুদ্ধের শব্দভাণ্ডার মুছে দিয়ে অন্য একটি আদর্শের শব্দভাণ্ডার চাপিয়ে দেয়, তখন সেটি একটি নীরব সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থান।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়—এটি একটি চলমান চেতনা। যে চেতনা ভাষার স্বাধীনতা, সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য ও মানুষের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করে। এই চেতনাকে অস্বীকার করা মানে জাতির অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। শহীদ মিনার ভাঙা মানে ইতিহাস ভাঙা, স্মৃতি ভাঙা, জাতির আত্মপরিচয় ভাঙা।
ভাষাগত আধিপত্য, ইতিহাস বিকৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতা—সবই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রকল্পের অংশ। এই প্রকল্প কেবল রাজনীতির মাঠে নয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিচালিত হচ্ছে। তাই প্রতিরোধও হতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক—সব স্তরে।
কথা চলুক। বিতর্ক চলুক। কারণ ভাষা, ইতিহাস ও চেতনার প্রশ্নে নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ নয়; নীরবতা সবসময় ক্ষমতার পক্ষেই দাঁড়ায়। আর বাঙালির ইতিহাস বলে—নীরবতা নয়, উচ্চারণই আমাদের মুক্তির পথ।
_ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ, ব্লক কে, বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চল, ঢাকা-1212
সম্পাদক
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু
নির্বাহী সম্পাদক
মতিউর রহমান
প্রকাশক
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিমিটেড
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিঃ এর একটি প্রতিষ্ঠান।
নিউজ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com
©২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |amadersomaj.com