মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ। লেখক ও কলামিস্ট।
শাস্তি নয়, প্রতিশোধ: নৈতিকতা ও আইনের মুখোমুখি রাজনীতি
সম্প্রতি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে.এম. নুরুল হুদাকে জনতা কর্তৃক ঘেরাও করে জুতাপেটা ও গলায় জুতার মালা পরানোর মতো বর্বর ও আইন অবমাননাকর ঘটনার খবর গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এটি কোনো একক অপরাধ নয়, বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একজন নাগরিক হিসেবে হুদা সাহেব যদি কোনো গুরুতর দায়িত্বহীনতা বা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক আচরণ করে থাকেন, তবে তার বিচার হওয়া উচিত আইনের কাঠগড়ায়, জনতার প্রতিশোধের আখড়ায় নয়।
আইনের শাসন বনাম জনতার রোষ
আমাদের সংবিধান বলে দেয়—“কেউ অপরাধী না, যতক্ষণ না আইনত প্রমাণিত হয়।” কিন্তু এই ঘটনার মাধ্যমে যেন রাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে জনরোষই এখন বিচারকের আসনে বসেছে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি নিজ হাতে বিচার করে, তাহলে আর আইন কিসের? তাহলে কি আমরা আবারো গণতন্ত্রের আড়ালে Lynch Law (ভিড়ের বিচারের আইন) প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি?
যারা নুরুল হুদার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, তাদের কথায় যুক্তি আছে— তিনি বিগত এক দশকে এমন সব নির্বাচন পরিচালনা করেছেন, যেখানে বিরোধী দলের শূন্য অংশগ্রহণ এবং শাসক দলের নিশ্চিত বিজয় গণতন্ত্রকে ম্লান করেছে। কিন্তু এই দোষ যদি সত্যও হয়, তার প্রতিকারের পথ আছে—দুর্নীতিবিরোধী কমিশন, আদালত, তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থা। কোনো সভ্য দেশে অপমানের মাধ্যমে বিচার চলে না।
নির্বাচন কমিশন: দায়িত্ব না, পুতুলের ভূমিকা?
সততার প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নুরুল হুদার আমলও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সরকারের প্রতি অতিরিক্ত নতি, বিরোধী দলকে মাঠছাড়া করার ক্ষেত্র প্রস্তুত রাখা, সেনা মোতায়েন না করে প্রশাসনের ওপর একতরফা নির্ভরতা—এসবই ছিল গণতন্ত্রের ক্ষরণ। ভোটারদের আস্থা হারিয়ে গিয়েছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গভীর সংকেত।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই দায়িত্বহীনতার মূল্য কি তাকে জুতাপেটা করে বুঝিয়ে দিতে হবে? রাষ্ট্র যদি ব্যর্থ হয়, তবে সেই দায় কি নাগরিক সমাজ পেশিশক্তি দিয়ে আদায় করবে?
রাজনীতিতে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার চাই
স্বৈরাচারী আমলে বা একদলীয় শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার নতুন কিছু নয়। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল্যবোধ তখনই টিকে থাকে, যখন বিচার হয় নীতির ভিত্তিতে, প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়। হুদা সাহেবের বিরুদ্ধে তদন্ত হোক, বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক—কিন্তু গলায় জুতার মালা দিয়ে অপমান করে আমরা রাষ্ট্রের চেহারাটাই বিকৃত করে ফেলছি।
উপসংহার: সহিংসতা নয়, সংবিধানই পথ
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো Due Process of Law — অর্থাৎ, আইনানুগ পদ্ধতিতে বিচারের নিশ্চয়তা। যারা আজ জনতার নামে বিচার করছে, তারাই কাল অন্যের টার্গেট হতে পারে। এটা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি।
তাই আমাদের বিবেককে জাগাতে হবে—একজন দুর্নীতিগ্রস্ত নির্বাচন কমিশনারের বিচার চাই, কিন্তু সেই বিচার হোক সংবিধান ও আইনের ভাষায়। নয়তো সামনে আসবে আরেকটি স্বৈরতন্ত্র, যার নাম হবে ‘জনতার রোষ’, কিন্তু যার মুখোশে লুকিয়ে থাকবে ন্যায়ের চরম অপমান।
- মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ, ব্লক কে, বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চল, ঢাকা-1212
সম্পাদক
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু
নির্বাহী সম্পাদক
মতিউর রহমান
প্রকাশক
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিমিটেড
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিঃ এর একটি প্রতিষ্ঠান।
নিউজ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com
©২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |amadersomaj.com