মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ। লেখক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সাল একটি অবিস্মরণীয় বছর—একটি জাতির রক্ত দিয়ে লেখা পুনর্জন্মের কাহিনী। সেই বছরেই বাঙালি জাতি, পাকিস্তানি শোষণ-নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে রচনা করেছিল স্বাধীনতার ইতিহাস। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম, আর লক্ষ লক্ষ মানুষের নিরবিচার আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এ স্বাধীনতা ছিল অবিভাজ্য, চূড়ান্ত ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাস ঘিরে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ নামক বিভ্রান্তিকর ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটি কেবল ইতিহাস বিকৃতিই নয়, বরং শহীদদের আত্মত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি চরম অবমাননা।
১৯৭১-এর প্রেক্ষাপট:
উপনিবেশিক শাসন শেষে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই শুরু হয় পূর্ববাংলার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণ—সবকিছু culminate করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত গণআন্দোলন এবং তাঁর দেওয়া ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে একটি জাতি যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট:
গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা, এবং জনআন্দোলনের নামে গঠিত কিছু অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দেশের ইতিহাসকে ‘পুনরায় লেখা’র চেষ্টা করছে। তাদের দাবি—তারা ‘দ্বিতীয় মুক্তি’ এনেছে বা আনতে চায়। এই দাবিকে খণ্ডন করা অতীব জরুরি, কারণ—
১. স্বাধীনতা একটি জাতির চূড়ান্ত স্বরূপ অর্জন। এটি একবারই হয়। একটি দেশ যদি একবার স্বাধীন হয়, তার পরে ঘটে যেতে পারে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ, সামরিক শাসন পতন, কিংবা নাগরিক অধিকার পুনর্দাবি—কিন্তু সেগুলো কখনোই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হতে পারে না।
২. স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধ নয়। হ্যাঁ, ২০২৪ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এ দেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটিকে কখনোই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সমতুল্য বলে প্রচার করা যায় না। কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই—একটি পরাধীন ভূখণ্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরের সংগ্রাম। আর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
৩. ভাষার অপব্যবহার ও ইতিহাস বিকৃতি: ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’, ‘নতুন মুক্তিযুদ্ধ’, ‘স্বাধীনতাহীন স্বাধীনতা’—এই শব্দগুচ্ছগুলো উদ্দেশ্যমূলক, বিভ্রান্তিকর এবং শহীদদের স্মৃতি অবমাননার নামান্তর। এসবের প্রচারে যারা যুক্ত, তারা নিঃসন্দেহে রাজাকার, আল-বদর, কিংবা তাদের আদর্শের পুনর্জাগরণকারী।
ইতিহাসের অপব্যাখ্যার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য:
‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র প্রচারণা একটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, যা একদিকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতাকে খাটো করে দেখে, অন্যদিকে বর্তমানের আন্দোলনকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরে। ইতিহাসের সঙ্গে এই ছিনিমিনি খেলা জাতির জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে বিভ্রান্তির বীজ বপন করে।
উপসংহার:
স্বাধীনতা একবারই অর্জিত হয়—যা আমরা করেছি ১৯৭১ সালে। পরবর্তী সব রাজনৈতিক লড়াই, সংগ্রাম, পরিবর্তন—তা যত বড়ই হোক না কেন, স্বাধীনতার তুল্যমূল্য হতে পারে না।
এ সত্য যতবার বিকৃত করার চেষ্টা হবে, ততবার আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে। ইতিহাসের প্রকৃত ব্যাখ্যা দিতে হবে, এবং শহীদদের স্মৃতির প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করতে হবে তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে।
তাই আসুন, বিভ্রান্তি নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে বলি—
“আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি ১৯৭১-এ, একবারই—সবচেয়ে মহিমান্বিতভাবে।”
একটি দেশ একবারই স্বাধীন হয়।
আমরা সেই মহান মুহূর্ত পেয়েছি ১৯৭১-এ।
আর কোনো “দ্বিতীয় স্বাধীনতা” নেই, হতে পারে না।
__ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও কলামিস্ট।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ, ব্লক কে, বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চল, ঢাকা-1212
সম্পাদক
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু
নির্বাহী সম্পাদক
মতিউর রহমান
প্রকাশক
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিমিটেড
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিঃ এর একটি প্রতিষ্ঠান।
নিউজ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com
©২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |amadersomaj.com