মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
সম্প্রতি সেনাবাহিনীর হাতে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ সহ তিনজন দুর্ধর্ষ অপরাধীর গ্রেফতার দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং জনগণের আস্থার জায়গা শক্তিশালী করেছে। তবে এটি শুধু একটি সূচনা — বরং আসল যুদ্ধটা গডফাদারদের বিরুদ্ধে।
গত ৯ মাসে রাজধানী ঢাকা এক ভয়াল নগরীতে পরিণত হয়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, গুম-খুন, মাদক ব্যবসা, মববাজি—সবকিছুই যেন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে চলছিল। এসব অপরাধ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত ২৫ বছরের রেকর্ডকে ভেঙে দিয়েছে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো—ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী—যেখানে নিরাপত্তার ছায়া থাকার কথা, সেখানে এখন কান্না আর আতঙ্কই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, যা একসময় ছিল নিরাপত্তা ও সুনামের প্রতীক, এখন সেখানে চাঁদাবাজরা দিব্যি রাজত্ব করছে। বাড্ডা, কুরিল, ৩০০ ফিট, পূর্বাচল, ডেমরা অঞ্চলে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই জীবন থমকে দাঁড়ায়। মাদকের অবাধ ছড়াছড়ি, গ্যাং কালচার, খুচরা অস্ত্রের ব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা এ সংকটকে আরও গভীর করেছে।
এই ভয়াবহ চিত্রের মূল কারণ একটাই—সন্ত্রাসের গডফাদাররা এখনও অধরা।
তাদের অবস্থান কেবল গ্যাং-নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়, তারা রাজনীতির আড়ালে, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা জনপ্রতিনিধির মুখোশ পরে সমাজে চলাফেরা করছে। তাদের রয়েছে ৪ থেকে ৫ স্তরের ক্যাডার নেটওয়ার্ক। ছিনতাই থেকে শুরু করে খুন পর্যন্ত সব অপরাধচক্রের অর্থনীতি কেন্দ্র করে চলে মূল শহরে—ঢাকায়। সেখান থেকে পাচার হয় লন্ডন, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, কলকাতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
আমরা সবাই জানি, এই সিন্ডিকেটগুলো একদিনে গড়ে ওঠেনি। তাদের পেছনে ছিল রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, প্রশাসনিক নীরবতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। তাই শুধুমাত্র অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ধরলেই কাজ হবে না, যদি না সন্ত্রাসের শিকড়—রাজনীতির গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেয়া হয়।
সেনাবাহিনীর করণীয়:
১. গডফাদারদের তালিকা প্রকাশ ও গ্রেফতার: শুধু মাঠ পর্যায়ের সন্ত্রাসী নয়, অর্থদাতাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
২. অর্থ পাচারের অনুসন্ধান: দুর্নীতির উৎস সন্ধান করে অর্থ পাচারের রুট বন্ধ করতে হবে।
৩.রাজনৈতিক সদিচ্ছার নিশ্চয়তা: রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছতা ও সন্ত্রাসমুক্ত অবস্থান নিশ্চিত না হলে অভিযান স্থায়ী ফল বয়ে আনবে না।
৪. সার্বিক গোয়েন্দা সমন্বয়: সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব এবং সিভিল প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
শেষ কথা:
আজ যদি আমরা এই অপরাধজগতের মূল গিঁটটি না কাটতে পারি, তাহলে প্রলয়ের আগুনে শুধু সাধারণ জনগণ নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরও একসময় পুড়ে ছাই হবে। সেনাবাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা যেন সমাপ্তিও টানে গডফাদারদের গ্রেফতারে—এই আমাদের প্রত্যাশা, এই আমাদের দাবি।
মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন