মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
"বাংলার মাটিতে রাজাকারপন্থী রাজনীতি অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে হবে"
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমানদের সমর্থন। তখনকার মুসলিম লীগের জনভিত্তি এবং 'মুসলমানের জন্য আলাদা রাষ্ট্র' ভাবনাটি মূলত এই জনপদের মানুষদের দ্বারাই বাস্তবতা লাভ করে। অথচ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক’মাস যেতে না যেতেই ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে বাঙালির স্বপ্নে আঘাত হানে পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্যবাদ।
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার সিদ্ধান্তে ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের, যার রক্তাক্ত চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।
তারপর থেকেই বাঙালির সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক বিষিয়ে উঠতে থাকে—ভাষা, অর্থনীতি, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী সবখানেই বাঙালির প্রতি বৈষম্য চলতে থাকে।
এই বৈষম্যের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠে স্বাধীনতার চেতনা। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি প্রাণ দিয়ে রক্ষা করে নিজের পরিচয়, নিজস্ব রাষ্ট্র, নিজস্ব ভবিষ্যৎ।
কিন্তু আজ সেই মহান মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে, যখন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত এ টি এম আজহারুল ইসলাম-এর মতো প্রমাণিত রাজাকার আদালতের আপিলে খালাস পেয়ে যায়।
১৯৭১ সালে আল-বদর বাহিনীর সক্রিয় সদস্য আজহার, যিনি রংপুর অঞ্চলে গণহত্যার অন্যতম নায়ক, তার খালাস কেবল একটি মামলার রায় নয়—এটি বাংলার সংগ্রামের ইতিহাসে এক মারাত্মক আঘাত।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): রাজাকারপন্থার নতুন মুখ?
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে "জাতীয় নাগরিক পার্টি" (এনসিপি)।
এই সংগঠনটি মূলত রাজাকারপন্থী উত্তরসূরিদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের মঞ্চে রূপান্তরিত হয়েছে।
তারা এক সময় ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিচিতি পেয়েছিল। অথচ, আজ তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথরেখা আঁকছে।
যখন একটি রাষ্ট্র তার ইতিহাসকে অস্বীকার করতে শুরু করে, তখন সে জাতি তার ভবিষ্যতের দিকচক্রবাল হারায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যেন সেই ইতিহাস বিকৃতির স্পষ্ট প্রকাশ।
তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রকাশ্য রাজপথে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নেতাদের প্রশংসা এবং যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সমর্থন আদতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চরিত্রকে কলঙ্কিত করছে।
শেখ হাসিনার শাসন ও বিরোধিতার বিকৃতি
দুঃখজনক হলেও সত্য—জনগণের প্রতি শেখ হাসিনার একনায়কতান্ত্রিক দমননীতি এই রাজাকারপন্থী গোষ্ঠীকে একধরনের গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
মানুষ যখন আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারিতায় অতিষ্ঠ, তখন ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে ভুল করে এনসিপির মতো গোষ্ঠীর দিকে মুখ ফিরিয়েছে।
এই ক্ষোভ যদি রাজনৈতিক সচেতনতায় না রূপ নেয়, তবে ইতিহাস এক ভয়াবহ চক্রে আবর্তিত হবে—যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা কাঠগড়ায় দাঁড়াবে, আর রাজাকাররা বিচারকের আসনে বসবে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি: একটি জাতির আত্মপরিচয়
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। এই স্মৃতিকে অস্বীকার করা মানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকেই অস্বীকার করা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো সংগঠন কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই নয়, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যবোধকেও বিপন্ন করে তুলছে।
এই সংগঠনকে অবিলম্বে বাংলার মাটি থেকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা জরুরি—রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে তাদের বিরুদ্ধে।
শেষ কথা
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত কারো খালাস পাওয়া মানে অপরাধের পরোক্ষ স্বীকৃতি নয়—এটা বিচার ব্যবস্থার ফাঁকফোকর।
কিন্তু জনগণ যদি তা ভুলে যায়, ক্ষমা করে দেয়, অথবা রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে নেয়—তবে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনীতি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের মানুষকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি আবারও ইতিহাসের বিপরীতে হাঁটব? নাকি বুকে আগলে রাখব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা?
আজই সময়—রাজাকারপন্থা ও তাদের উত্তরসূরিদের রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার।
বাংলাদেশ কারো দয়া নয়, কোটি প্রাণের বিনিময়ে কেনা স্বাধীনতা।
এই স্বাধীনতার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাদের বাংলার মাটিতে কোনো স্থান নেই—এই ঘোষণাই হোক জাতির শপথ।
✍️ মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ
লেখক ও কলামিস্ট।
মতামত
এখনো কোনো মতামত নেই। আপনিই প্রথম মতামত দিন!
আপনার মতামত দিন