ঢাকা, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :
প্রকাশিত : ০৬:৫১ পিএম, ১৭ এপ্রিল ২০২৫
Digital Solutions Ltd

ওয়াকফ আইন ও সংখ্যালঘু অধিকার: রাষ্ট্র কি সবার জন্য সমান?



প্রকাশিত : ০৬:৫১ পিএম, ১৭ এপ্রিল ২০২৫

মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ। লেখক ও কলামিস্ট।



মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ :

ভারত, একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে, সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নাগরিকদের সমান অধিকার প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু যখন কোনো আইনি পরিবর্তন একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে, তখন সেই নীতিগত পদক্ষেপের যৌক্তিকতা এবং ন্যায়সংগততার প্রশ্ন ওঠে। ঠিক এমনটাই ঘটেছে ভারতের প্রস্তাবিত নতুন ওয়াকফ আইনকে কেন্দ্র করে।

 

ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রমের প্রাণ। এটি শুধু জমি বা স্থাপনা নয়, বরং মুসলমানদের ধর্মীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এসব সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা জরুরি হলেও, তার জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও সম্মতি। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা একতরফা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এসব ক্ষেত্রে কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে না।

 

বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে—তারা যদি মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্বেগ এবং দাবিগুলোর প্রতি আন্তরিক মনোযোগ দেয় এবং প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা ও সংশোধনী আনে, তবে তা হবে শুধু মুসলমানদের আস্থা অর্জনের পথ নয়, বরং ভারতের বহুত্ববাদী সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

 

ভারতের প্রায় ২০ কোটিরও বেশি মুসলমান নাগরিক এই রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা উন্নয়ন, শিক্ষা, ব্যবসা, সংস্কৃতি—সর্বক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কোনো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও অধিকারকে বাদ দিয়ে যদি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ হয়, তবে তা সামগ্রিক সামাজিক সংহতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

এই প্রসঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রমাণিত হবে তখনই, যখন তারা এই আইন প্রণয়নের পেছনে থাকা সংশয়গুলো দূর করতে সচেষ্ট হবে। মুসলমানদের দাবিগুলো শুনে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল আইন তৈরি করা হলে—তাতে সরকার যেমন রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে, তেমনি জাতি হিসেবে ভারতও এগিয়ে যাবে আরো দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে।

 

শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, ন্যায়, সংবেদনশীলতা ও সমতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হলেই তা হয়ে ওঠে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক। সময় এসেছে, ভারত সেই উচ্চতাতেই পৌঁছাক—যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও অধিকার সমানভাবে মর্যাদা পায়।

 

সম্প্রতি ভারতীয় সংসদে প্রস্তাবিত নতুন ওয়াকফ আইনের খসড়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই আইনটি কেবল একটি প্রশাসনিক নীতিমালা নয়, বরং এটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

 

ভারতের সংবিধান সকল ধর্মের মানুষের বিশ্বাস, সম্পদ এবং উপাসনার অধিকার নিশ্চিত করেছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ওয়াকফ সম্পত্তি হলো একটি পবিত্র ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এটি মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, দরগাহ এবং নানা জনসেবামূলক কাজের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

 

নতুন আইনের মাধ্যমে ওয়াকফ বোর্ডের স্বাধীনতা ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর যে দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠছে, তা অনেকের কাছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর একপ্রকার প্রশাসনিক চাপ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক কাঠামোর ওপরে সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, একটি বহুধার্মিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কতটা গ্রহণযোগ্য—এই প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে।

 

এই আইনের প্রেক্ষিতে যে প্রতিক্রিয়া উঠছে, তা নিছক রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়। এটি মূলত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আত্মবিশ্বাস ও নিরাপত্তাবোধের প্রতিফলন। রাষ্ট্র যদি একটি সম্প্রদায়ের প্রথাগত সম্পদ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলে, তবে তা নাগরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস ও দূরত্ব তৈরি করতে পারে।

 

যদি এই আইনের মূল লক্ষ্য হয় ওয়াকফ সম্পত্তির স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা, তবে তার জন্য প্রয়োজন ছিল সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আগাম সংলাপ, বোর্ডের কাঠামোতে সংস্কার এবং সমন্বয়ের ভিত্তিতে আধুনিকীকরণ। আইন প্রয়োগে সংবেদনশীলতা না থাকলে তা উদ্দেশ্য সফল না হয়ে বরং উল্টো সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

 

বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমন আইন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই এই মুহূর্তে সরকারের উচিত হবে—আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে সকল পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসা, এবং নিশ্চিত করা যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না হয়।

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য তার বহুত্ববাদে। সেই বহুত্বকে রক্ষা করতে হলে, প্রতিটি সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয় ও সম্পদের প্রতি সমান মর্যাদা প্রদর্শনই হতে হবে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।

 

মোহাম্মদ শেখ কামালউদ্দিন স্মরণ

লেখক ও কলামিস্ট। 

বাংলাদেশ

সম্পাদকীয় বিভাগের অন্যান্য খবর



 Amadersomaj News
Follow Us

শহীদ সোহরাওয়ার্দী এভিনিউ, ব্লক কে, বারিধারা কূটনৈতিক অঞ্চল, ঢাকা-1212

সম্পাদক
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু

নির্বাহী সম্পাদক
মতিউর রহমান


প্রকাশক
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিমিটেড
আমাদের সমাজ মিডিয়া লিঃ এর একটি প্রতিষ্ঠান।

নিউজ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com

বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +1 916-934-7384
Email: amadersomajonline@gmail.com

DMCA.com Protection Status

©২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |amadersomaj.com